ধান গেছে পানিতে, ঋণের চাপ নিয়ে ঘরে ফেরার দুশ্চিন্তায় জিরাতিরা
কৃষি
প্রকাশঃ ১৩ মে, ২০২৬ ১২:১৭ অপরাহ্ন
অতিবৃষ্টির ধাক্কায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবার বোরো মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন লক্ষাধিক কৃষক। সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন জিরাতি পরিবারগুলো। প্রতিবছরের মতো এবারও অস্থায়ী কুঁড়েঘরে থেকে হাওরে বোরো চাষ করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু মৌসুমের শেষদিকে টানা বৃষ্টি ও পানি বাড়ায় অনেকের ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে বৈশাখ শেষে স্বস্তি নিয়ে ঘরে ফেরার বদলে ঋণ ও অনিশ্চয়তার বোঝা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে তাঁদের।
স্থানীয় সূত্র ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে অন্তত পাঁচ শতাধিক জিরাতি পরিবার প্রতিবছর অস্থায়ীভাবে বসবাস করে বোরো আবাদ করেন। হাওরের নির্জন কান্দা বা গো-চরে খড়কুটো ও বাঁশ-ছন দিয়ে তৈরি ছোট ছোট কুঁড়েঘরেই কয়েক মাস কাটে তাঁদের। অগ্রহায়ণ থেকে বৈশাখ পর্যন্ত পরিবার নিয়ে সেখানে থাকেন তাঁরা। জমি চাষ, ধান রোপণ, পরিচর্যা ও কাটাকাটির পুরো কাজই করেন নিজেরা।
ধর্মপাশা উপজেলার সানবাড়ি গ্রামের জিরাতি কৃষক অখিল তালুকদার বলেন, বর্ষার ভাঙন আর বড় ঢেউয়ের কারণে তাঁদের অনেকের পৈতৃক ভিটা বহু আগেই বিলীন হয়ে গেছে। পরে অন্যত্র বসতি গড়লেও হাওরে কিছু জমি রয়ে গেছে। সেই জমিতেই বছরের একমাত্র ফসল বোরো আবাদ করেন তাঁরা।
অখিল তালুকদার বলেন, ছয় মাসের হাড়ভাঙা পরিশ্রম জলে গেছে। এবার ঋণ মেটানোই দায় হয়ে দাঁড়াইছে।
জামালগঞ্জ উপজেলার হালি হাওরের রাঙ্গিয়া কান্দায় গিয়ে দেখা যায়, অস্থায়ী হুরার সামনে ধান মাড়াই করছেন জিরাতি সুজন মিয়া ও তাঁর স্ত্রী নাছিমা বেগম। বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে হাওরের কুঁড়েঘরে থেকে এবার ১০ কিয়ার জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক জমির ধান পানিতে নষ্ট হয়েছে।
সুজন মিয়া বলেন, এইখানে চার কিয়ার জমির ধান ভাঙানি হইতাছে। এইটা কাটাইতে খরচ হইছে ২৬ হাজার টাকা। নৌকা দিয়া ধান আনা আর ভাঙানির খরচও আছে। ১০ কিয়ার জমি করতে সার, বীজ, হালচাষ আর রোপণে প্রায় ৬০ হাজার টাকা লাগছে। এরপর থাকা-খাওয়ার খরচ তো আছেই।
বছরের খোরাক হবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, চার কিয়ারে ৫০ থেকে ৬০ মণ ধান হতে পারে। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি, মাড়াই আর আনুষঙ্গিক খরচ মেটানোর পর ঋণের চাপ থেকেই যাবে।
একই হাওরের আরেক জিরাতি কৃষক নবী হোসেন বাবার সঙ্গে ধান ওড়াচ্ছিলেন। তিনি বলেন, আট কিয়ার জমির মধ্যে মাত্র তিন কিয়ারের ধান কাটতে পেরেছেন। বাকি পাঁচ কিয়ারের ধান পানিতে ডুবে গেছে।
নবী হোসেন বলেন, এই তিন কিয়ারে যা ধান পাইছি, তাতে ছয় মাসের খোরাক হবে হয়তো। বাকি ছয় মাস ঋণ কইরা চলতে হইব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামালগঞ্জের হালি হাওরের রাঙ্গিয়া ও হেরাকান্দি, পাগনা হাওরের এলংজুড়ি বিল ও আইলা বিলের পার, ধর্মপাশার সোনামড়ল হাওরের সানবাড়ি এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে জিরাতি পরিবারগুলো অস্থায়ীভাবে বসবাস করে। মৌসুম শেষে ধান ঘরে তুলেই তাঁরা নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যান। তবে এবার অধিকাংশ পরিবারই লোকসানের মুখে পড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এবার সুনামগঞ্জ জেলার ছোট-বড় ১৯৩টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। জেলায় কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন। গত রোববার পর্যন্ত হাওরের ৮২ দশমিক ২৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, গত সোমবার সকাল পর্যন্ত জেলায় ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নদ-নদীর পানি ১৩ সেন্টিমিটার কমলেও তা এখনো বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে। সামনে আরও অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় হাওরের অবশিষ্ট ধান দ্রুত কেটে ফেলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জিরাতিদের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান কৃষি বিভাগের কাছে নেই। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক।
তিনি বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হচ্ছে। ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হবে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা সাড়ে সাত হাজার টাকা ও এক বস্তা চাল পাবেন। কম ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহায়তার পরিমাণ কিছুটা কম হবে।
সুনামগঞ্জ, কৃষক, জিরাতি, অতিবৃষ্টির, হাওর