
এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ হাওর হাকালুকি ঘিরে হাজারো কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকা। কিন্তু প্রতি বছর বোরো মৌসুম এলেই আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের শঙ্কা তাড়া করে ফেরে তাদের। এবারও চলতি বৈশাখে টানা ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ধানক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে ধান ঘরে তোলা নিয়ে উৎকণ্ঠায় পড়েন কৃষকেরা।
তবে গত তিন দিন ধরে আবহাওয়া অনুকূলে আসায় নতুন উদ্যমে ধান কাটায় নেমেছেন হাওরপারের মানুষ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারী-পুরুষ সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো ও ঘরে তোলার কাজে।
কোরবানপুর, সাদিপুর, গৌড়করণ, মহেষগৌরী, চিলারকান্দি, শমারকান্দি ও ভুকশিমইলসহ হাকালুকি হাওর তীরের বিভিন্ন গ্রামে এখন এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
জয়চন্ডী ইউনিয়নের আবুতালিপুর গ্রামের কৃষক ললিত চন্দ্র নাথ, জিতেন্দ্র দাস, কাজল মিয়া ও উস্তার মিয়ারা জানান, গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পানির ভেতর থেকেই ধান কাটতে হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও পানিতে অনেক ধানে পচন ধরেছে। এখন রোদ ওঠায় দ্রুত মাড়াই ও শুকানোর কাজ করছেন তারা।
তাদের ভাষ্য, হাওরের পানি কিছুটা কমে যাওয়ায় ডুবে থাকা অনেক জমি আবার ভেসে উঠেছে। এখন আর ফলনের হিসাব নয়, যেভাবেই হোক ধান শুকিয়ে গোলায় তুলতে পারলেই তারা স্বস্তি পাবেন।

বেগমানপুর গ্রামের কৃষক খেলা বিশ্বাস বলেন, “প্রতিবছরই আগাম বন্যার আতঙ্কে থাকতে হয়। ধান রোপণের পর থেকে ঘরে তোলা পর্যন্ত দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ে না।”
এদিকে কৃষকদের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কথা শোনা গেলেও সেখানে প্রকৃত কৃষকের নাম বাদ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের লোকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা বলছেন, সরকারি সহায়তা
হাকালুকি হাওর থেকে নৌকায় ধান নিয়ে ফিরছিলেন কোরবানপুর গ্রামের আশি বছরের বৃদ্ধ জমির মিয়া, হাওরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, “আগে এমন ছিল না। এখন মনে হয় প্রতি বছর কৃষকের স্বপ্ন ভাঙতেই আগাম বন্যা আসে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য, হাকালুকি হাওরে মাছের পাশাপাশি বোরো ধানই কৃষকের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু হাওরসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় ভারি বৃষ্টি হলেই প্রথম ধাক্কা লাগে এখানকার ফসলে।
ভুকশিমইল ইউনিয়নের সদস্য মধু মিয়া ও জয়চন্ডী ইউনিয়নের সদস্য বিমল দাস বলেন, হাকালুকি হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। না হলে প্রতিবছর কৃষকের ক্ষতি বাড়তেই থাকবে।
কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে তালিকা প্রস্তুতের দায়িত্ব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের (পিআইও)। তিনি বলেন, হাকালুকি হাওরকে হাওর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ফসল রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার সুযোগ থাকত।
এ বিষয়ে বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকাভুক্ত করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে। পাশাপাশি আগাম বন্যা থেকে বোরো ফসল রক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নেও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
শেয়ার করুনঃ
কৃষি থেকে আরো পড়ুন
হাকালুকি হাওর, বোরো ধান, আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল, কুলাউড়া কৃষক


