
সোমবার সকালে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন ইউসুফ আলী। পাশে মেয়ে, ভাতিজি ও ভাতিজি জামাই। সবাই এক আশায় শুরু করেছিলেন যাত্রা, সিলেটে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাবেন। চার বছরের অসুস্থতা থেকে হয়তো এবার মিলবে মুক্তি।কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হয়নি। সড়কেই থেমে গেলো বেঁচে থাকার যাত্রাপথ।
সোমবার (৪ মে) দুপুরে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ছাতক উপজেলার জালালপুর এলাকায় পৌঁছানোর পরই ঘটে দুর্ঘটনা। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জগামী রিফাত পরিবহনের একটি বাস হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে তাদের বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সবকিছু।
ঘটনাস্থলেই মারা যান ইউসুফ আলী (৫৫) ও সিএনজি চালক। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে একে একে মারা যান তার মেয়ে কেয়া আক্তার (১৫), ভাতিজি নিলুফা আক্তার (৩৫) এবং ভাতিজি জামাই মো. শাহাব উদ্দিন (৩৯)।সবাই একই পরিবারের।
সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার তিওর জালাল গ্রামের এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করছিল। চার বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন ইউসুফ আলী। অর্থের অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। রোববার রাতে তার অবস্থার অবনতি হলে প্রতিবেশীরা চাঁদা তুলে তাকে সিলেটে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।সেই সহায়তার পথই হয়ে উঠল মৃত্যুর পথ।
মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে ইউসুফ আলীর মরদেহ দাফন করা হয়েছে। তবে তার সঙ্গে যাওয়া বাকি তিনজনের মরদেহ তখনো গ্রামে পৌঁছেনি। একের পর এক লাশ ফেরার অপেক্ষায় শোকস্তব্ধ পরিবার।
নিহত ইউসুফ আলীর বৃদ্ধা মা জাবেদা খাতুনের কান্না যেনো থামছেই না, ভাঙ্গা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা ৪ টা বছর ধইরা অসুস্থ। ছেলারে বাঁচানোর লাইগা সিলেটে পাঠাইলাম, ছেলে আমার লাশ হইয়া ফিইরা আইলো।’
একসঙ্গে মেয়ে ও জামাই হারিয়ে দিশেহারা স্বপ্না বেগম। তার চোখেমুখে যেনো এখন পাঁচ নাতির অন্ধকার ভবিষ্যৎ। আমার মেয়ে মেয়ের জামাই একলগে মইরা গেলো আমি এখন ৫ জন নাতি নিয়া কই যাইমু?
ইউসুফ আলীর শ্যালিকা মমতাজ বেগম বলেন, টাকা না থাকায় ঠিকমতো চিকিৎসা করাইতে পারি নাই। শেষমেশ মানুষজন চাঁদা তুলে পাঠাইল, কিন্তু সেই পথেই সবাই শেষ হইয়া গেল।
প্রতিবেশী মো. সেবুল বলেন, ‘খুবই দরিদ্র পরিবার আছিল। সবাই মিলে সাহায্য কইরা সিলেট পাঠাইছিলাম। ভাবি নাই এভাবে লাশ হয়ে ফিরবো।’
প্রতিবেশী ও স্বজনরা বলছেন, অভাবই ছিল এই পরিবারের সবচেয়ে বড় শত্রু। সময়মতো চিকিৎসা হলে হয়তো এই যাত্রা লাগত না।একটি দুর্ঘটনা নিভে গেলো পাঁচটি প্রাণ। আর পেছনে রয়ে গেল ভাঙা একটি পরিবার, অনিশ্চিত কয়েকটি জীবন।
দুর্ঘটনার বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানান, সিএনজি চালকসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। ঘটনার তদন্ত চলছে।
শেয়ার করুনঃ
দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন
সুনামগঞ্জ, সড়ক দুর্ঘটনা, তাহিরপুর


