১৬ এপ্রিল ২০২৬

দৈনন্দিন / মৃত‍্যু

চার দশক প্রবাস কাটানো রেমিট্যান্স যোদ্ধার শেষ বিদায়েও ভোগান্তি

বাণিজ্যমন্ত্রীর সহযোগীতায় দেশে ফিরল মরদেহ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:৩২ অপরাহ্ন

ছবিঃ সিলেট ভয়েস গ্রাফিক্স

মাত্র ১৭-১৮ বছর বয়সেই সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হয়ে বাহরাইনে পাড়ি দিয়েছিলেন গিরিশ সূত্রধর। দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর প্রবাস জীবনে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে। ৬০ বছর বয়সী এই রেমিট্যান্স যোদ্ধার শেষ বিদায়টা হয়েছে অত্যন্ত করুণ গল্পে।  

 

৪০ বছর যেই দেশ থেকে গিরিশ সূত্রধর রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, মৃত্যুর পর সেই দেশেই তার মরদেহ আটকা পড়েছিল অর্থাভাবে। মরদেহ পাঠাতে দূতাবাস থেকে ৬ লক্ষ টাকা দাবি করা হলে ভেঙে পরে তার পরিবার।।অসহায় এই পরিবারটি দেশ থেকে টাকা পাঠাতে পারছিলো না। এ অবস্থায় মরদেহ দেশে আনার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন গিরিশ সূত্রধরের পরিবারের সদস্যরা।

 

অবশেষে বাণিজ্যমন্ত্রীর খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রচেষ্ঠায় সরকারি খরচে গিরিশ সূত্রধরের মরদেহ দেশে ফিরেছে। বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলা ইউনিয়নের সতর মাঝপাড়া গ্রামে গিরিশ চন্দ্রের বাড়িতে এসেছে তার নিথর মরদেহ। 

 

বিকেলেই আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ শেষকৃত্য হয়েছে। গিরিশ চন্দ্র সূত্রধর ওই এলাকার মৃত দূর্গা চরণ সূত্রধর ছেলে। 

 

সাত ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে বড় ছেলে বাধন সূত্রধর ১০ম শ্রেণি ও ছোট খেলে প্রান্ত সূত্রধর ষষ্ঠ শ্রেণিতের পড়াশোনা করছে। আর একমাত্র মেয়ে কলি সূত্রধর সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।  

 

বুধবার বিকেলে সতর মাঝপাড়া গ্রামের দূর্গা বাড়িতে গিয়ে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য চোখে পড়ে। বাড়ির লম্বা উঠানের এক পাশে মরদেহ মাঝখানে রেখে স্বজনরা চারপাশ ঘিরে রেখেছেন। গিরিশ চন্দ্রের স্ত্রী জলি সূত্রধর সন্তানদের নিয়ে মাটিতে লুটে পড়ে কান্নাকাটি করছিলেন। তাদের আর্তনাদে বাড়ির চারপাশের পরিবেশ কাঁদছিল। পাশেই গিরিশের ভাই-ভাতিজাসহ স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে বাড়ির পাশেই নিয়ে তার শেষকৃত্য করা হয়। 

 

গিরিশ চন্দ্রের স্বজনরা জানান, গত ২৫শে মার্চ বাহরাইনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গিরিশ। তার মৃত্যুতে পরিবার যখন শোকস্তব্ধ, তখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের আচরণ। মরদেহ দেশে আনার জন্য দূতাবাসে যোগাযোগ করেন তার এক ভায়রা ভাই। 

 

তারা অভিযোগ করে বলেন, মরদেহ দেশে পাঠাতে দূতাবাস থেকে ১৮০০ দিনার (প্রায় ৬ লক্ষ টাকা) দাবি করা হয়। কিন্তু পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র এবং এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। টাকা জোগাড় করতে না পারায় মরদেহ সেখানেই সৎকার করার কথা ভাবছিলো পরিবারটি। 

 

এই মানবিক সংকটে গিরিশ চন্দ্রের পরিবারের পাশে দাঁড়ান স্থানীয় বিএনপি নেতা আলী আকবর। তার মাধ্যমে বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে জানানো। তিনি পরবর্তীতে এক বার্তায় জানান মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা হবে। 

 

অবশেষে বুধবার সরকারি খরচেই গিরিশ চন্দ্রের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। বুধবার সকাল ৮টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে গিরিশ চন্দ্রের মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে মরদেহ গ্রহণ করেন এবং তা নিহতের ছোট ভাই সমর চন্দ্র সূত্রধরের কাছে হস্তান্তর করেন।

 

এ সময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

 

তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে ৩৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ওয়ারিশ সনদ প্রাপ্তি সাপেক্ষে নিহতের পরিবারকে আরও ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করার আশ্বাস দেওয়া হয়। 

 

বুধবার বিকেলে গিরিশ চন্দ্রের বাড়িতে কথা হয় তার ভগ্নিপতি সুদাংশু সূত্রধরের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাহরাইনে গিরিশের ভায়রা ভাই দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। তখন দূতাবাস থেকে বলা হয় ১৮০০ দিনার (যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৬ লাখ) লাগবে। তবেই মরদেহ পাঠানো যাবে। আর সময় লাগবে ৭-১২দিন। কিন্তু এতো টাকা দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় আমরা হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। পরে প্রতিবেশি আলী আকবর নামে এক বিএনপি নেতা বাণিজ্যমন্ত্রীকে বিষয়টি জানান। অবশেষে মন্ত্রীর উদ্যোগে সরকারি খরচেই মরদেহ দেশে এসেছে। 

 

গিরিশ চন্দ্রের আরেক স্বজন নিরঞ্জন সূত্রধর বলেন, ‘প্রবাসীরা দেশের উন্নয়নের জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দেয়, অথচ তাদের মরদেহ নিয়ে দূতাবাসগুলো যদি এমন অমানবিক আচরণ করে, তাহলে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা কোথায় যাবে?নতিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রবাসীদের মরদেহ হয়রানি ছাড়াই দেশে আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

 

গিরিশ সূত্রধরের ছোট ভাই সমর সূত্রধর বলেন, ৪০ বছর তিনি প্রবাসেই কাটিয়েছেন। কিন্তু নিজে কিছু অর্জন করেননি। বাহরাইনের হাসপাতালে পাঁচদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। পরে তার মরদেহ দেশে আনা আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠেছিল। অবশেষে সকলের সহযোগীতায় মরদেহটি আমাদের হাতে এসেছে। 

 

এ বিষয়ে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দূতাবাসের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে সেবা দেওয়া। সেখানে যদি কেউ মানুষকে হয়রানী করে, তাহলে  প্রবাসীরা যাবেন কোথায়। দূতাবাসে হয়রানী রোধে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

প্রবাস রেমিট্যান্স যোদ্ধা, শেষ বিদায়, ভোগান্তি, গিরিশ সূত্রধর, সিলেট

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ