১৭ এপ্রিল ২০২৬

কৃষি / চাষাবাদ

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর

নলুয়ার হাওরে জলাবদ্ধতা, ডুবছে ফসলি জমি

স্থায়ী সমাধান হিসেবে ‘স্লুইসগেট’ চান কৃষকেরা

প্রতিনিধি, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ৮ এপ্রিল, ২০২৬ ৬:১১ অপরাহ্ন


টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিপাতে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় বিভিন্ন হাওরে বেশকিছু ফসিল জমি তলিয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় হাওরে বড় ধরনের জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। হাওরের একমাত্র বোরোফসল ঘরে তোলা নিয়ে চরম শঙ্কায় দিন পাড় করছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা। এ অবস্থায় অসময়ে জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পেতে চূড়ান্ত সমাধান চান তারা।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতায় উপজেলার ভরাম, নলুয়া মইয়া হাওরসহ ছয়টি হাওরের মোট ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর আবাদি জমি ডোবার পানিতে তলিয়ে গেছে। একইসঙ্গে ১৫০ হেক্টর জমি অর্ধ-নিমজ্জিত রয়েছে। তবে বাস্তবে এর থেকে বেশি জমি জলাবদ্ধতার কারণে পানিতে তলিয়ে গেছে বলে বেশ কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে।


সরেজমিনে হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে জগন্নাথপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে ফসলি জমিগুলো তলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় অসময়ে জলাবদ্ধতার হাত থেকে ফসলকে রক্ষা করতে অনেক জায়গায় বেড়িবাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন করছেন স্থানীয় কৃষকেরা।


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টির পানিতে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতার পানি নেমে গেলে ফসলের কোন ধরনের ক্ষতি হবে না।

জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ বলেন, ‘এখনো ফসলের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। জলাবদ্ধতার পানি নেমে গেলে নিমজ্জিত জমিগুলোরও কোন ক্ষতি হবে না। যদি পানি নেমে না যায় তাহলে ফসলের ক্ষতি হবে। তখন আমরা খোঁজখবর নিয়ে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ প্রকাশ করবো। জলাবদ্ধতা থেকে ফসল বাঁচাতে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে এবং সে বিষয়টি জেলা প্রশাসক আমলে নিয়ে আগামী বছর থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নিবেন।’

সরকারি হিসেব মতে, ইতোমধ্যে ডুবে গেছে ১৫০ হেক্টর জমির বোরো ফসল। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতার পরিমাণ ব্যাপকহারে বাড়তে পারে। পিংলা, নলুয়া, মইয়া হাওরসহ বেশ কয়েকটি হাওর ঘুরে দেখা গেছে, বোরোধান সোনালী বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। ১০-১৫ দিন পরই হাওরে ধান কাটা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যে ফসল নির্বিঘ্নে ঘরে ওঠার কথা, সেখানে এখন কোথাও কোমর সমান পানি, আবার কোথাও বুক সমান পানি। জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত কৃষকেরা জমির দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় দেখছে না।

কৃষকদের দাবি, প্রত্যেকটি হাওরের বেড়িবাঁধের পয়েন্টে পয়েন্টে মিনি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হলে এই জলাবদ্ধতা নিরসন করা যাবে। তারা জানান, স্লুইসগেট স্থাপনের পাশাপাশি হাওরে ভরাট হয়ে যাওয়া বিল ও খাল খনন করা অতি জরুরি।

হাওরের কৃষক প্রমোদ দাস জানান, ইতিমধ্যেই তার ৪-৫ বিঘা জমি জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত হয়েছে। ধান পরিপক্ব না হওয়ায় সেই জমিগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। বেড়িবাঁধে মিনি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হলে তার মতো আরো শতাধিক কৃষক জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচবে।

কৃষক নেতারা ও হাওর নিয়ে কাজ করা সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দরাও একই কথা বলছেন। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন জগন্নাথপুর শাখার সভাপতি আব্দুল কাদির বলেন, ‘যে যাই বলুন, বোরোধানের দীর্ঘদিনের পুরনো সমস্যা জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে- বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে পয়েন্টে মিনি স্লুইসগেট নির্মাণ করা। পাহাড়ি ঢলে নদীতে হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ার ফলে নির্মিত বাঁধ কেটে জলাবদ্ধতা নিষ্কাশনে অনেকটাই ঝুঁকি থাকে। তাই কোন ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই জলাবদ্ধতার একমাত্র স্থায়ী সমাধান হিসেবে স্লুইসগেট স্থাপন করা অতিব জরুরি।’

এটা হাওরাঞ্চলের প্রত্যেকটা কৃষক ও শ্রমিকের প্রাণের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা নিরসনে স্লুইসগেট নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়ার কোন বিকল্প নেই।’

তিনি পাউবোসহ বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আমলে নিয়ে কাজ করলে হাওর ও ফসলের ব্যাপক উন্নয়ন হবে। এবং একমাত্র স্লুইসগেট স্থাপনের মাধ্যমেই হাওরাঞ্চলের কৃষক জলাবদ্ধতা নামক দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পাবে।’

‘হাওরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে স্লুইসগেট ও বিল খননের ব্যাপারে কাজ করছে প্রশাসন’ উল্লেখ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরকত উল্লাহ বলেন, ‘ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্পট বাচাই করে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামী মৌসমে কাজ শুরু হবে।’

জগন্নাথপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে বাঁধের যে যে জায়গায় রেগুলেটর বা স্লুইসগেট প্রয়োজন আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। যে যে পয়েন্টে স্লুইসগেট স্থাপন করা দরকার আমরা সেই তালিকা জেলা অফিসে পাঠিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে খাল ও বিল খনন করা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমরা এগুলোর তালিকা উর্ধতন কতৃপক্ষকে পাঠিয়েছি। প্রকল্পটি পাশ হলে জলাবদ্ধতা খুব দ্রুত নিরসন হবে।’


শেয়ার করুনঃ

কৃষি থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুর উপজেলা, হাওর, জলাবদ্ধতা, বোরোফসল, হাওরপাড়ের কৃষক

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ