০১ মে ২০২৬

অপরাধ-বিচার / আটক-গ্রেপ্তার

হবিগঞ্জে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করে ‘ধর্ষণের’ অভিযোগে গ্রেপ্তার ১

প্রতিনিধি, হবিগঞ্জ

প্রকাশঃ ৯ মার্চ, ২০২৬ ১১:০৪ অপরাহ্ন


হবিগঞ্জে মানবাধিকার সংগঠনের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে অসহায় নারীদের ধর্ষণ, ব্ল্যাকমেইল ও পর্নোগ্রাফি চক্র পরিচালনার অভিযোগে কথিত মানবাধিকার নেতা নুরুল ইসলাম ওরফে নুরুল হককে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। রোববার (৮ মার্চ)  সন্ধ্যায় চুনারুঘাট উপজেলায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

 

গ্রেপ্তার নুরুল হক বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের লাকুড়ীপাড়া গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেকে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সিলেট বিভাগীয় সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিতেন।

 

গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র‍্যাব-৯, সিপিসি-৩, শায়েস্তাগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মো: সাজ্জাদ হোসেন। 

 

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নুরুল হক ‘দরিদ্র কল্যাণ সংস্থা ও ‘মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা’নামের দুটির নাম ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে এক ভয়াবহ অনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। অসহায়, দরিদ্র পরিবারের কিশোরী, তরুণী এবং স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে তিনি তাদের লন্ডনে পাঠানোর প্রলোভন দেখাতেন। 

 

অভিযোগ রয়েছে, তিনি ভুক্তভোগীদের ফোন-সেক্স ও ধর্ষণে বাধ্য করতেন। শুধু তাই নয়, ধর্ষণের সময় গোপনে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে সেগুলো বিদেশে পাচার করার এক রোমহর্ষক চিত্রও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

 

মামলার এজাহার অনুযায়ী, চুনারুঘাট উপজেলার এক তরুণী বছরখানেক আগে নুরুল হকের সংস্থায় অফিস সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই নুরুল হক তাকে বিভিন্নভাবে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মহাশয়ের  বাজারের তার কার্যালয়ের ভেতরেই তাকে প্রথমবার জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ধর্ষণের সময় নুরুল হক কৌশলে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে রাখেন। পরবর্তীতে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টানা পাঁচ মাস তাকে জিম্মি করে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়।

 

লোমহর্ষক অভিযোগে ওই তরুণী জানান, তাকে অচেতন নাশক ওষুধ খাইয়ে নুরুল হকের বন্ধু ও প্রবাসীদের হাতেও তুলে দেওয়া হতো। সম্প্রতি তিনি চাকরি ছেড়ে দিলে সেই আপত্তিকর ভিডিওগুলো বিদেশে থাকা বন্ধুদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

 

জানা গেছে, শুধু একজন নয়, ওই প্রতিষ্ঠানের আরও একাধিক নারী কর্মী একই লালসার শিকার হয়েছেন। চুনারুঘাট ও বাহুবলের আরও দুই তরুণী একইভাবে ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রভাবশালী চক্রের ভয় এবং সামাজিক লোকলজ্জার কারণে এতদিন তারা মুখ খোলার সাহস পাননি। এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাশিদা নামে এক শিক্ষার্থী হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। 

 

নুরুল ইসলাম ওরফে নুরুল হক নিজেকে কখনো এনজিও কর্মকর্তা, কখনো মানবাধিকার নেতা, আবার কখনো গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতেন। ২০১৪ সালে হবিগঞ্জ সদরের বাতাশর এলাকায় বিলাসবহুল অফিস নিয়ে তিনি তার এই ‘প্রতারণার রাজ্য’ শুরু করেছিলেন। তৎকালীন কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকে ‘মানবাধিকার কার্ড’ বিলি করে তাদের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি এসব অপকর্ম চালিয়ে যেতেন। তার আয়ের অন্যতম উৎস ছিল সাধারণ মানুষের চুরি হওয়া মোবাইল উদ্ধার বা কল লিস্ট বের করে দেওয়ার নাম করে অবৈধ তথ্য সংগ্রহ এবং মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া।

 

সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দেখা যায়- ১৬ বছরের এক কিশোরীকে লন্ডনে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে নুরুল হক যৌন হয়রানি করছেন। ভিডিওতে তাকে ইমোর মাধ্যমে জনৈক এক প্রবাসীর সাথে ওই কিশোরীকে ‘ফোন সেক্স’ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

 

বাহুবল মডেল থানায় ভুক্তভোগী ৪ তরুণী পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। মামলায় মূল অভিযুক্ত নুরুল হকসহ তার সহযোগী ওসমানীনগরের আবুল বশর (মামুন বখত) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। 

 

গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মো: সাজ্জাদ হোসেন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নুরুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মানবাধিকার সংস্থার আড়ালে দীর্ঘদিন অসহায় নারীদের ব্ল্যাকমেইল ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসার কথা স্বীকার করেছেন। 

 

বাহুবল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: সাইফুল ইসলাম জানান, মামলার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। পলাতক থাকা অবস্থায় র‍্যাবের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় । এখন তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হবে।


শেয়ার করুনঃ

অপরাধ-বিচার থেকে আরো পড়ুন

হবিগঞ্জ, বাহুবল, ধর্ষণ, ব্লাকমেইল, গ্রেপ্তার

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ