০৩ মে ২০২৬

দৈনন্দিন

‘সমালোচিত’ সিলেটে ‘আলোচিত’ ডিসি সারওয়ারের সামনে যত চ্যালেঞ্জ

মোসাইদ রাহাত

প্রকাশঃ ২১ আগস্ট, ২০২৫ ৭:২৭ অপরাহ্ন

ছবিঃ সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম

সিলেটের সাদা পাথর লুট নিয়ে সারাদেশে তোলপাড়ের মধ্যেই সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেছেন মো. সারওয়ার আলম। এর আগে তিনি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (সংযুক্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও দেশব্যাপী ভেজাল ও দুর্নীতির বিরোধী পরিচালিত অভিযানের কারণে দেশজুড়ে আলোচিত।

দুর্নীতিবাজদের মধ্যে এক সময়ের আতঙ্ক সেই সারওয়ার আলম এবার কঠিন সময়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেছেন। সাদা পাথর কাণ্ডে যেখানে প্রশাসনের ‘আপ টু বটম’ জড়িত, সেখানে জেলার শীর্ষ পদের দায়িত্ব কতটা কঠোরভাবে পালন করবেন সেটাই এখন সবচেয়ে বড় এবং প্রথম চ্যালেঞ্জ। এছাড়া জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাও তার সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
  
অবশ্য প্রথম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে এরই মধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন এই আলোচিত কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার দায়িত্ব গ্রহণের দিনই সাদা পাথর পরিদর্শনে যান তিনি। বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) বিকেলে সাদা পাথরের পরিদর্শন করে পাথর প্রতিস্থাপনের কাজও ঘুরে দেখেন জেলা প্রশাসক। 
পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নবাগত জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, সাদাপাথর থেকে যাতে আর একটি পাথরও চুরি না হয় সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সাদা পাথরকে আগের রূপে ফিরিয়ে দিতে যা যা করা দরকার তাই করা হবে।  তিনি আরো বলেন, কারা এই লুটের সাথে জড়িত, কেন এবং কিভাবে হয়েছে সেগুলোও পর্যালোচনা করা হবে।

কোনো চাপ অনুভব করছেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, জনগণ আমাদের শক্তি। ইতোমধ্যে জনগন এই লুটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

সম্প্রতি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর, জাফলং ও উৎমাছড়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধ পাথর উত্তোলন। বিশেষ করে ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরে গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে অবাধে অনেকটা প্রকাশ্যে লুটপাট চলে আসছিল। সম্প্রতি বেপরোয়া পাথর লুটের কারণে সাদা পাথর অনেকটা পাথরশূন্য হয়ে পড়ে। পাথর লুটের পর সরকারের উচ্চমহলে বিষয়টি আলোচিত হলে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। সেজন্য পরিবেশবিদরা মনে করেন, লুটপাটে যেমন পরিবেশ ও নদীভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। সেজন্য নতুন জেলা প্রশাসকের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

এছাড়া প্রকৃতি কন্যা হিসেবে খ্যাত সিলেট জেলায় পর্যটন খাত অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অবকাঠামোগত ঘাটতি, নিরাপত্তাহীনতা, যাতায়াত অব্যবস্থাপনা ও দখলদার চক্রের কারণে ভ্রমণকারীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এক্ষেত্রে পর্যটন খাতকে সুশৃঙ্খল করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, নতুন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। গণঅভ্যুত্থানের পর প্রাণ প্রকৃতিকে সমন্বিত সিলেটের বালু, পাথর, টিলা কাটা বেড়েই গিয়েছে বিগত সরকারের আমলেও যেটি হয়নি সেটা এবার আমরা দেখেছি সাদা পাথরের ঘটনায়। 

তিনি আরও বলেন,  ‘অবাক করার বিষয় এনসিপি যাদের নিয়ে আমাদের স্বপ্ন তাদের মতো একটি দলও এসব লুটপাটে অংশগ্রহণ করেছে, এছাড়া প্রশাসনের কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, ইউএনও, পুলিশ সবার ইচ্ছেই এমন লুটপাট হয়েছে তাই আমি মনে করি যেহেতু নবাগত জেলা প্রশাসক সারওয়ার আগে র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন সেইভাবেই তিনি সকল দলীয় প্রভাবকে পাত্তা না দিয়ে তিনি যেই কাজের জন্য উনি এসেছেন সেই কাজটিই তিনি করবেন। উনার সামনে পাথর লুটপাটে জড়িত সে যেইহোক, রাজনীতিবিদি থেকে প্রশাসনেরই কর্মচারী সবাইকে আইনের মাধ্যমে শাস্তির মুখোমুখি করানোটাই এখন তার কাছে বড় চ্যালঞ্জ।’

অন্যদিকে প্রতিবছর সিলেটে বড় ধরনের বন্যা ও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। আগাম প্রস্তুতি ও দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জেলা প্রশাসকের জন্য আরেকটি বড় দায়িত্ব হবে। প্রবাসী নির্ভর অর্থনীতির জন্যও পরিচিত সিলেট। প্রবাসীদের জমি-সম্পত্তি দখল ও হয়রানির অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। নতুন জেলা প্রশাসকের কাছে প্রবাসীরা কার্যকর ভূমিকাও আশা করছেন।

যুক্তরাজ্য প্রবাসী সিলেটের চৌখিদেখি এলাকার বাসিন্দা নূর চৌধুরী বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকি কিন্তু অনেক সময় অনেক রাজনৈতিক নেতারা আমাদের জায়গা দখলের পায়তারা করেন, আমরা প্রবাসে থাকা এবং দখলকারীরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় আমরা অনেক সময় ন্যায় বিচার পাই না, সেজন্য আমি প্রবাসী সিলেটবাসীদের পক্ষ থেকে এটাই বলতে চাই নতুন জেলা প্রশাসক যেনো প্রবাসীদের জমি-সম্পত্তি দখল ও হয়রানি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেন।  
 
এদিকে, রাজনৈতিকভাবে সিলেট সবসময়ই সংবেদনশীল একটি অঞ্চল। বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ, মিছিল-সমাবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ জেলা প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন রাখাটা তার জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)'র সদস্য সচিব আবদুল করিম চৌধুরী (কিম) বলেন, যেই সময়টাতে জেলা প্রশাসক হিসেবে মো. সারওয়ার আলম এসেছেন এটি সত্যিই কঠিন সময়। সেজন্য উনার সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে যার মধ্যে অন্যতম সিলেটের প্রকৃতি, পাহাড়, নদীগুলো রক্ষা করা। একটা জিনিস সিলেটের মানুষ বিশ্বাস করেই ফেলেছে যারা উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনে যারাই আসেন তারা এসবে জড়িয়ে পড়েন যার উদাহরণ সাদা পাথর লুটপাট।

তিনি আরও বলেন, পর্যটনের জন্য সিলেট অন্যতম কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যটকদের মনে সিলেট নিয়ে একটি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে এছাড়া পর্যটকদের পর্যটন স্পটে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যোগাযোগের অনুন্নতা রয়েছে সেদিকেও উনাকে কাজ করতে হবে। বর্তমানে কোন জনপ্রতিনিধি নেই সেজন্য উনাকে সিলেট নগরীতে যে যানযট সৃষ্টি হচ্ছে সেদিকেও একটা ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া যে পরিমাণ নদী খাল ছড়া দখল করা হচ্ছে সেগুলো নিয়ে প্রশাসনকে আরো কড়া হতে হবে। সেজন্য বলাই যায় নব্য জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে অনেক চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়েই কাজ করে যেতে হবে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর নবাগত জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম গণমাধ্যমকে বলেন, এখানে আমরা বেশ কয়েকটা জিনিসকে গুরুত্ব দেয়া হবে, যার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা, পরিবেশ, পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব এ জেলার জন্য এবং জেলার মানুষের জন্য কাজ করতে। সিলেট আমাদের প্রকৃতি কন্যা তাই প্রকৃতি কন্যা প্রকৃতির মতোই তাকে সেটা আমরা সবাই মিলে কাজ করব।

তিনি বলেন, এখানে অবশ্যই উন্নয়ন হবে তবে সেটি হতে হবে টেকসই উন্নয়ন, যাতে কোনভাবেই পরিবেশের ক্ষতি না হয় কারণ আমি নিজেও পরিবেশের ছাত্র সেজন্য পরিবেশটা যেন সুন্দর রেখে উন্নয়ন করা যায়।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, ডিসি সারওয়ার, সিলেট

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ