০৪ মে ২০২৬

দৈনন্দিন

‘পুলিশ হত্যা’ নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনের প্রতিবাদে বানিয়াচংয়ে মানববন্ধন

প্রতিনিধি, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ

প্রকাশঃ ২৭ জুলাই, ২০২৫ ৮:১০ অপরাহ্ন


হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে বাছাই করে ‘পুলিশ হত্যা‘ শীর্ষক বিবিসি বাংলার প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (২৭ জুলাই) সকাল ১০টায় বানিয়াচং বড়বাজার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘বানিয়াচংয়ের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা‘ ব্যানারে বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন জুলাই অভ্যুত্থানের আহত যোদ্ধারা, অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের মানুষ। 

গত ২৫ জুলাই বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচংয়ে ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের দিনে সংঘর্ষ, থানায় হামলা, পুলিশের গুলিতে নিহতের বিষয়টি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি বাংলা। 

বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়-বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচংয়ে পাঁচই অগাস্টের অভ্যুত্থানের দিনে সংঘর্ষ, থানায় হামলা, পুলিশের গুলিতে গ্রামবাসীর মৃত্যুর পর সেনাবাহিনী, প্রশাসনের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর 'পুলিশ হত্যা'র দাবি নিয়ে দরকষাকষির এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ওইদিন বিক্ষুব্ধ লোকজন বানিয়াচং থানায় আক্রমণ চালিয়ে অস্ত্র লুট ও অগ্নিসংযোগ করে এবং অর্ধশতাধিক পুলিশকে অবরুদ্ধ করা হয়। 

এর আগে সেখানে পুলিশের গুলিতে অন্তত আটজন গ্রামবাসী নিহত হয়। পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর পর হাজার হাজার গ্রামবাসী থানা ঘেরাও করে সেখানে থাকা সব পুলিশকে হত্যার হুমকি দেয়। দিনভর আলাপ আলোচনার পর গভীর রাতে পুলিশ সদস্যদের থানার ভেতর থেকে উদ্ধারের সময় এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে বাছাই করে ছিনিয়ে নিয়ে থানা চত্তরেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন ছয়ই অগাস্ট তার মরদেহ থানার সামনে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

বানিয়াচংয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা শেষ পর্যন্ত সন্তোষ চৌধুরীকে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে অনঢ় অবস্থানে ছিল বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয়রা। সেনাবাহিনীর সঙ্গে জেলার এসপি, ডিসি এমনকি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একযোগে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সন্তোষ চৌধুরীকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেননি।

বিবিসির এই এ প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বানিয়াচংবাসী। এর প্রতিবাদে রোববার সকালে মানববন্ধন করেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। মানববন্ধনে সংক্ষুব্দ ব্যক্তিদের হাতে প্লেকার্ডে লেখা ছিল- ‘রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না/হত্যাকারী সন্তোষের বিচার চাই; ‘BBC মিথ্যা বলেছে/এটা সাংবাদিকতা নয়, ষড়যন্ত্র।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলহাজ লুৎফুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক নকিব ফজলে রকিব মাখন, সাংবাদিক মোতাব্বির হোসেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা খায়রুল ঠাকুর, সৈয়দ সোহেল ঠাকুর, রিমন মিয়া, আজাদ লস্কর, আবু সুফিয়ান তন্ময়, জিসান রহমান, বাসিক মিয়াসহ অনেকেই।

নকিব ফজলে রকিব মাখন তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালিয়ে ৯ নিরীহ ছাত্র-জনতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অথচ বিবিসি তাদের নাম তো দূরে থাক, তাদের অস্তিত্বই অস্বীকার করেছে। শহীদদের ইতিহাস মুছে দিয়ে একজন অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে বীর  সাজানোর চেষ্টা করেছে। এমন অপসাংবাদিকতা ইতিহাস ক্ষমা করবে না।'

তিনি আরও বলেন, ‘বিবিসির প্রতিবেদনে শুধু সত্য গোপন করা হয়নি, বরং ইতিহাসকেই বিকৃত করা হয়েছে। পুলিশের গুলিতে শহীদ ৯ তরুণ—যাদের কেউ মাত্র স্কুলে ভর্তি হয়েছিল, কেউ ছিল স্বপ্নময় যুবক—তাদের নাম-চেহারা-স্বপ্ন কোনো কিছুরই জায়গা হয়নি এই প্রতিবেদনে।‘

ফজলে রকিব মাখন আরও বলেন, ‘অভিযুক্ত এসআই সন্তোষ—যার বিরুদ্ধে ঘুষ, মাদক ও নিরীহ জনগণকে হয়রানির বহু অভিযোগ রয়েছে-তাকে বানানো হয়েছে মহান চরিত্র।‘ 

গণুভ্যুত্থানে নিহত হাসাইনের বাবা ছানু মিয়া কান্নাজড়িত গলায় বলেন, 'আমার ছেলে স্কুলে ভর্তি হয়ে মাত্র এক বছর কাটিয়েছিল। বই-খাতা ছাড়া কিছু চিনত না। বিবিসির প্রতিবেদনে মনে হচ্ছে, সে ছিলই না—কেউ যেন তাকে গুলি করেনি, বুক ঝাঁঝরা হয়নি!'

আরেক নিহত তোফাজ্জলের মা হেনা বেগম বলেন, 'সে কেবল স্লোগান দিয়েছিল, হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। তবুও পুলিশ গুলি চালিয়ে আমাদের স্বপ্ন ধ্বংস করেছে। আর বিবিসি বলছে, পুলিশ আত্মরক্ষায় গুলি চালিয়েছে! এটি তো সর্বোচ্চ মিথ্যার দৃষ্টান্ত।'

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল শহীদ মিনার থেকে উপজেলা ও থানার দিকে এগোলে পুলিশ বাধা দেয় এবং হঠাৎ গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৭ জন, হাসপাতালে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ