০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানবিকতা / সহায়তা

মেয়েকে হারিয়েছেন পানিতে, এখন অন্য শিশুদের বাঁচাতে সাঁতার শেখান বাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৪:৩৫ অপরাহ্ন


পানির ভয় কাটাতে শিশুদের দৃঢ় হাত ধরে নিয়ে যান সফিউল আলম। একটি পুকুরে শিশুরা হাত-পা ছুড়ে সাঁতার শেখার চেষ্টা করছে। কেউ পানিতে ভেসে থাকার কৌশল রপ্ত করছে, কেউ বা প্রশিক্ষকের নির্দেশনা মেনে শ্বাস-প্রশ্বাসের কলাকৌশল শিখছে। দৃশ্যটি সাধারণ প্রশিক্ষণ মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক হৃদয়বিদারক গল্প।


প্রায় দুই বছর আগে সফিউল আলম পানিতে ডুবে তার মেয়ে তাহিয়াকে হারিয়েছেন। সেই শোক এখনো তার কাঁধে চেপে বসে আছে। কিন্তু দুঃখের কাছে হার মানেননি তিনি। নিজের হারানো সন্তানের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিষ্ঠা করেছেন 'তাহিয়া একাডেমি'। এই একাডেমির মূল লক্ষ্য - শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো।


এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সকাল ১০টায় সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন লক্ষণশ্রী জামে মসজিদের পুকুরে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকার শিশু ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়। পানিতে নামার আগে শিশুদের দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। প্রথমে তাদের পানির ভয় দূর করে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা হয়। এরপর শেখানো হয় পানিতে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া, ভেসে থাকা এবং ধীরে ধীরে সাঁতারের বিভিন্ন কৌশল।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিশুদের পানিতে নামিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় সফিউল আলমের চোখে-মুখে থাকে এক ধরনের দৃঢ়তা। যে পানি কেড়ে নিয়েছে তার সন্তানকে, সেই পানিকেই এখন শিশুদের জন্য নিরাপদ করে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি।


সফিউল আলম বলেন, ❝তাহিয়াকে হারানোর পর থেকেই মনে হয়েছে, সাঁতার জানা থাকলে হয়তো অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই মেয়ের স্মৃতিতে তাহিয়া একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছি। যতদিন বেঁচে থাকব, শিশুদের সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কাজ করে যেতে চাই।❞


তিনি মনে করেন, হাওরাঞ্চলের বাস্তবতায় সাঁতার শেখার গুরুত্ব আরও বেশি। বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ এলাকা পানির রাজ্যে পরিণত হয়। বাড়ির উঠান থেকে শুরু করে স্কুলে যাতায়াত - জীবনের নানা প্রয়োজনে পানির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করতে হয় শিশুদের। অথচ অনেক শিশুই সাঁতার জানে না।


সফিউল আলম বলেন, সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। আগে হাওরপাড়ের মানুষের জীবন পানির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। শিশুরাও ছোটবেলা থেকেই পানিতে চলাফেরা ও সাঁতার শেখার সুযোগ পেত। এখন আধুনিক সুযোগ-সুবিধার কারণে অনেক শিশুর সেই অভ্যাস নেই।


তাহিয়া একাডেমির এই উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে ফায়ার সার্ভিসও। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। এতে শিশুদের সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি পানিতে দুর্ঘটনার সময় করণীয় সম্পর্কেও সচেতন করা হচ্ছে।


শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাই নূরানীয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক বলেন, শিক্ষার্থীদের সাঁতার শেখানোর উদ্দেশ্যেই তাদের এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি আগে থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ নিতে হবে।


শেয়ার করুনঃ

মানবিকতা থেকে আরো পড়ুন

তাহিয়া একাডেমি, সাঁতার প্রশিক্ষণ, সফিউল আলম, শিশু সুরক্ষা, পানিতে ডুবে মৃত্যু, হাওরাঞ্চল

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ