মৌলভীবাজারে কমছে বন্যার পানি, গো-খাদ্য সংকটে গবাদিপশু
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ১৩ জুলাই, ২০২৬ ১:৪৯ অপরাহ্ন
টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। সেই সঙ্গে উজান থেকেও ঢলের চাপ আগের তুলনায় কমতে শুরু করায় হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় পানি নেমে যাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে পানি সরে গেলেও ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও গ্রামীণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
হবিগঞ্জে জেলার বেশির ভাগ এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। কেবল কয়েকটি নিম্নাঞ্চলে এখনো পানি রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পানি কমে যাওয়ায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদসহ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রায় খালি হয়ে গেছে। পরিবারগুলো বাড়ি ফিরলেও তাদের অনেকের ঘর কাদা ও আবর্জনায় ভরে গেছে। নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী।
জেলার আব্দাবখাই, নোয়াগাঁও ও কালীগঞ্জ এলাকার কিছু অংশ ছাড়া অধিকাংশ স্থান থেকে পানি সরে গেছে। তবে বন্যা-পরবর্তী নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট, কাদায় ভরা সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও বাঁধ সংস্কার, পাশাপাশি খাদ্য ও পুনর্বাসন সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
বন্যার প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। নিম্নাঞ্চলের আউস ধান ও অন্যান্য ফসলের জমি ডুবে গিয়ে অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মঈনুল হক বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় এখনো পানি রয়েছে, সেগুলোর পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, মৌলভীবাজারেও বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। উজানে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় জেলার মনু, ধলাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে কয়েক দিন ধরে পানিবন্দি থাকা মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন।
সম্প্রতি টানা বর্ষণ ও নদীর বাঁধ ভেঙে রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। প্রায় ৩৫টি গ্রামের অর্ধলাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। তলিয়ে যায় বসতবাড়ি, সড়ক ও ফসলি জমি। এখন পানি কমতে শুরু করলেও অনেক পরিবার ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন নিয়ে ঘরে ফিরছেন।
রাজনগরের টেংরা ইউনিয়নের কথা বলে জান যায়, টানা তিন দিন পানির নিচে থাকার পর শনিবার রাত থেকে তাদের বাড়িঘর থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে অনেক পরিবার এখনো সরকারি সহায়তা পায়নি। কোথাও কোথাও শিশুদের মধ্যে জ্বর ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। প্রয়োজনীয় ওষুধও মজুত রয়েছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাদ্য, চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বন্যাকবলিত এলাকায় মেডিক্যাল টিম কাজ করছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বন্যায় আউস ধান, আমনের বীজতলা ও মৌসুমি সবজির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কৃষকদের পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বন্যার কারণে জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৌলভীবাজার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আব্দুল্লাহ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। জরিপ শেষ হলে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
হবিগঞ্জ বন্যা, মৌলভীবাজার বন্যা, সিলেট বন্যা, বন্যা পরিস্থিতি, বন্যার পানি, আশ্রয়কেন্দ্র, মনু নদী, ধলাই নদী, জুড়ী নদী, কুশিয়ারা নদী, কৃষি ক্ষতি, গ্রামীণ সড়ক ক্ষতি, বন্যা আপডেট, সিলেট বিভাগ, বাংলাদেশ বন্যা