
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মকসদপুরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দে গ্রামছাড়া রয়েছেন অধিকাংশ পুরুষ সদস্য। ফলে অনেকটাই ‘পুরুষশূন্য’ হয়ে পড়েছে গ্রামটি। এ অবস্থায় চলতি বোরো মৌসুমে ফসল ঘরে তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসী।
তাদের অভিযোগ, এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ ও একাধিক মামলার জেরে গ্রামটির অধিকাংশ পুরুষ বাড়িছাড়া রয়েছেন। ফলে গ্রামে বর্তমানে নারী ও শিশুর উপস্থিতির সংখ্যাই অনেকটা বেশি বলে জানান গ্রামবাসী।
গ্রামবাসী জনান, দীর্ঘদিন ধরে আবু হানিফের ছেলে নুরুজ্জামানের (৪৫) সঙ্গে গ্রামবাসীর সঙ্গে বিরোধ চলছিল। এতে বিভিন্ন ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করেন নুরুজ্জামান।
সরেজমিনে গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলার কারণেই অধিকাংশ পুরুষ বর্তমানে বাড়িছাড়া রয়েছেন। এ অবস্থায় বাড়ির নারী, বৃদ্ধ ও শিশুরা অনেকটাই আতঙ্কে দিনপার করছেন বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতবছর গ্রামবাসীর যৌথ মালিকানাধীন একটি ছোট জলমহাল ইজারা দেওয়ার জন্য উন্মুক্ত নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন নুরুজ্জামান। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে জলমহালটি ইজারা পান গ্রামের জুনেদ মিয়া। এ ঘটনার পর থেকেই নুরুজ্জামান ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
গ্রামবাসী জানান, ইজারার কিছুদিনের মধ্যেই গভীর রাতে জলমহালে বিষ প্রয়োগ করে মাছের ক্ষতি করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে শালিস বৈঠক বসে। সেখানে অভিযোগ প্রমাণিত হলে নুরুজ্জামান দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং জরিমানা দেন বলেও জানান তারা।
গত বছরের ২৯ জুলাই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নুরুজ্জামান ও তার ভাই নুর উদ্দিনের সঙ্গে মাসুম চৌধুরীর বিরোধ হয়। এ ঘটনায় মাসুম ও তার পরিবারের সদস্যদের আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। পরে মামলার ভয়ে পলাতক থাকতে বাধ্য হন মাসুম ও তার পরিবারের সদস্যরা।
এ অবস্থায় মাসুমের ফাঁকা বাড়ি থেকে মালামাল ও একটি নৌকা নিয়ে নেওয়া হয়। পরে নৌকাটি পার্শ্ববর্তী রাজনগর গ্রামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়। যদিও খবর পেয়ে পুলিশ সেটি উদ্ধার করে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, যৌথ সম্পত্তি নিয়ে এক বৈঠকে সাজুল হকের ওপর হামলার অভিযোগও ওঠে নুরুজ্জামান ও তার স্বজনরা। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়।
গত ১৫ অক্টোবর গ্রামের ২২ খতিয়ানের ওয়ারিশানদের যৌথ জমিতে নুরুজ্জামান তার বোনের জন্য ঘর নির্মাণের চেষ্টা করলে গ্রামবাসী বাধা দেন। বিষয়টি আদালতে গড়ালে আদালত নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেন।
কিন্তু গত ১৪ জানুয়ারি সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আবার ঘর নির্মাণের চেষ্টা করা হলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় শারীরিকভাবে অসুস্থ মিহির চৌধুরীকে প্রধান আসামি করে ৭৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী আব্দুর রউফ বলেন, সংঘর্ষের সময় আমি পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে আহত হই। কিন্তু আমাকে না জানিয়েই মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে। এজাহারে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি জানান, আরও কয়েকজনকেও তাঁদের অজান্তে সাক্ষী করা হয়েছে। তাঁরা গত ৩০ মার্চ আদালতে এ বিষয়ে এফিডেভিট দিয়েছেন।
গ্রামবাসীর দাবি, ঘটনার দিন অনেক আসামিই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। একই ঘটনায় তাদের পক্ষ থেকেও পাল্টা মামলা করা হয়েছে।
বর্তমানে মামলার ভয়ে অধিকাংশ পুরুষ গ্রামছাড়া। এতে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে ফসল ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
গ্রামের প্রবীণ জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, একজন মানুষের কারণে পুরো গ্রামের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই, কিন্তু বারবার মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
সাজুল হক বলেন, আমার ওপর হামলা করা হয়েছে। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু উল্টো আমাদের বিরুদ্ধেই মামলা দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা পরিমল দাস বলেন, পুরুষরা মামলার ভয়ে পালিয়ে আছে। বাড়িতে নারী-শিশুরা অসহায় অবস্থায় আছে। আমরা এই পরিস্থিতির অবসান চাই।
এদিকে গ্রামবাসীর অভিযোগ, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর নুরুজ্জামান ও তার স্বজনরা নিজেদের বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণ ও লুটপাটের অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।
অভিযুক্ত নুরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী বলেন, মকসদপুর গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। উভয় পক্ষই মামলা করেছে। বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ায় আছে।
শেয়ার করুনঃ
দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন
দিরাই, সুনামগঞ্জ, মামলা


