সিলেটে সড়কে প্রাণ হারানো ৮ মরদেহ বহনে অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা দিল এসনিক
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১১:২৮ অপরাহ্ন
১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আসাম প্যাটার্নের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ এই টার্মিনাল একসময় দেশের অন্যতম নান্দনিক বাস টার্মিনাল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু উদ্বোধনের কয়েক বছরের মধ্যেই অব্যবস্থাপনা ও অযত্নে বেহাল হয়ে পড়েছে পুরো কমপ্লেক্স।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় এই অবস্থা থেকে উত্তরণে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। তবে সিলেট সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক বলছেন, খুব দ্রুতই অত্যাধুনিক বাস টার্মিনালটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর কোনো গাড়ি রাস্তায় থাকতে পারবে না।
আসাম প্যাটার্নের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। সু-বিশাল কমপ্লেক্সে রয়েছে আলাদা আগমন ও বহির্গমন টার্মিনাল, পাঁচতলা গোলাকার প্রশাসনিক টাওয়ার। রয়েছে আধুনিক কন্ট্রোল রুম, পুলিশ ও পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, রেস্টুরেন্ট, ফুড কোর্ট, ভিআইপি বিশ্রামাগার, ব্রেস্ট ফিডিং ও স্মোকিং জোন, নারী-পুরুষ ও অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য আলাদা শৌচাগার, পৃথক নামাজের ব্যবস্থাসহ আধুনিক যাত্রীসেবা ব্যবস্থা। যাত্রীদের জন্য রয়েছে ৯৭০ আসনের বিশাল হল ও ৩০টি টিকিট কাউন্টার। ৩০০ ফুট দীর্ঘ বহির্গমন অংশে আরও রয়েছে একসঙ্গে ৪৮টি বাস রাখার ব্যবস্থা।
অত্যাধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও অযত্ন ও ব্যবহারের অভাবে ভেতরে ভূতুরে অবস্থা সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের। জং পড়েছে চেয়ারগুলোতে। খসে পড়ছে লাইট-ফ্যান। দুই তলা ভবনের নিচতলায় চালক ও হাতেগোনা যাত্রীদের বিচরণ থাকলে একেবারে ফাঁকা দ্বিতীয় তলা। সুনশান নিরবতায় ভর দুপুরেও মনে হবে এটা কোনো ভূতের বাড়ি। দামি কাচের তৈরি দেয়ালজুড়ে টানানো পরিবহন শ্রমিকদের নির্বাচনী লিফলেট ও ব্যানার যেন অব্যবস্থাপনার নীরব সাক্ষী।
পাঁচতলা গোলাকার প্রশাসনিক টাওয়ারের ভেতরের অবস্থা কেউ বলতেই পারবে না। নির্মাণের পর হয়তো আর কারও চরণ পড়েনি সেখানে। দুই তলায় ভিআইপি লাউঞ্চ পরিবহন শ্রমিকরা বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহার করছেন। ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই ভবনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে তিনটি পাবলিক টয়লেট।
ঐতিহ্যবাহী কিন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়ি ও আসাম প্যাটার্নের বাংলো স্থাপত্যরীতিতে গড়ে তোলা সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল দেশের অন্যতম নান্দনিক এবং আধুনিক বাস টার্মিনাল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিলেট সিটি কর্পোরেশন মিউনিসিপ্যাল গভর্নমেন্ট সার্ভিস প্রজেক্ট (এমজিএসপি)-এর আওতায় এই প্রকল্পের কাজ শুরু করে। প্রায় ৮ একর জমির উপর নির্মিত এই টার্মিনাল কমপ্লেক্সে মোট ব্যয় ধরা হয় ১১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডাম্পিং গ্রাউন্ডের জন্য বরাদ্দ ছিল ৫৬ কোটি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ৬১ কোটি টাকা।
২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে টার্মিনালটি চালু করা হয়। ওই বছরের ১৫ নভেম্বর সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এর উদ্বোধন করেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই নির্মাণে বিভিন্ন ত্রুটির অভিযোগ ওঠে এবং সিটি করপোরেশন সমালোচনার মুখে পড়ে। গঠিত হয় তদন্ত কমিটিও। এরপর থেকে প্রকল্পটি ঘিরে আর তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ বা দৃশ্যমান তদারকি দেখা যায়নি। এমনকি পূর্ণাঙ্গভাবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও হয়নি টার্মিনালটির।
এর টার্মিনালটির দেখভালের দায়িত্ব চলে যায় ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের হাতে। সিসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ৫৬ লাখ টাকায় এক বছরের জন্য টার্মিনালটি ইজারা দেওয়া হয়। ইজারাদারের সীমিত রক্ষণাবেক্ষণ দায়িত্ব থাকলেও বড় কোনো সংস্কারের দায় সিটি করপোরেশনের ওপর রয়েছে।
প্রথমে টার্মিনালটি ইজারা নেন সেলিম আহমদ নামে এক ব্যাক্তি। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট ৫৬ লাখ টাকায় এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। এক বছর ইজারাদার সুবিধাভোগ করলেও রক্ষণাবেক্ষণ করতে দেখা যায়নি।
সিসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, গত বছরের ১ জুলাই থেকে টার্মিনালের যানবাহন ও কাউন্টার হতে টোল আদায়ের লক্ষ্যে ১ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকায় এক বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন মো. মিজানুল ইসলাম নামে এক ব্যাক্তি। বর্তমানে তিনি টার্মিনালের দেখভাল করেন।
এদিকে, নতুন টার্মিনালে অব্যবস্থাপনার কারণে আগের মতোই সড়কে অর্ধেকজুড়ে রাখা হচ্ছে বড় বড় বাস। এতে করে আগের মতোই যানজটে ভুগতে হয় নগরবাসীকে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না এটা ঠিক। কারণ দুই বছর ধরে ধার করা প্রশাসনে চলছিল সিটি করপোরেশন। আমরা যখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পাবো, তখন এটা নিয়ে বসবো। ইজারাদার কতটুকু করবে, আর আমরা কতটুকু করবো সেটা নির্ধারণ করা হবে। অবশ্যই এটার নান্দনিকতা ফিরিয়ে আনা হবে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, খুব দ্রুতই বাস টার্মিনালটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর কোনো গাড়ি রাস্তায় থাকতে পারবে না। প্রতিটি গাড়ি টার্মিনালের ভেতর থেকে ছেড়ে যেতে হবে। সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়াও ভেতরে যেরকম সংস্কার সবটুকু করা হবে।
সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, আসাম প্যাটার্ন, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা