সিলেটে হারানো ৭০ মোবাইল উদ্ধার, মালিকদের হাতে তুলে দিল এসএমপি
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ৫:০৯ অপরাহ্ন
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে পুলিশের গুলিতে ঝরে পড়ে তরুণ ছাত্রদের প্রাণ। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সেই আত্মদান ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করে। কিন্তু সেই দিনটি শুধু রাজধানীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ঢাকার রক্তাক্ত ঘটনার প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় সিলেটেও। ক্ষোভ, শোক ও প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে এই জনপদের ছাত্রসমাজ ও সচেতন নাগরিকরা।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পর থেকেই পূর্ববাংলায় অসন্তোষ বাড়তে থাকে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে গড়ে ওঠে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্রদের মিছিল এবং পরবর্তী গুলিবর্ষণের ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন তোলে। ২২ ফেব্রুয়ারি সেই খবর সিলেটে পৌঁছালে স্থানীয় ছাত্রসমাজ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করেন। জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকার শহীদদের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হবে। কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে মিছিল বের হয়ে জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, কোর্ট পয়েন্টসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না”—এসব স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজপথ।
প্রবীণদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, সেই দিনগুলোতে শহরের পরিবেশ ছিল টানটান উত্তেজনাপূর্ণ। অনেক দোকানপাট আংশিকভাবে বন্ধ ছিল। সাধারণ মানুষও ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি শোকমিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গোবিন্দচরণ পার্কে আয়োজিত এক জনসভায় ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়। কালো ব্যাজ ধারণ ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে ঢাকার শহীদদের স্মরণ করা হয়।
১৯৫২ সালে ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনার পরের দিন সিলেটের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে তিনি তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘বেলা ১১টার আগেই কর্মসূচির ঘোষণা-সংবলিত পোস্টারে শহরের দেয়াল ছেয়ে যায়। বেলা তিনটায় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা দলে দলে গোবিন্দচরণ পার্কে (বর্তমান হাসান মার্কেট) সমবেত হতে শুরু করে।
ঢাকার মতো সিলেটে গুলিবর্ষণের ঘটনা না ঘটলেও প্রশাসন সতর্ক অবস্থান নেয়। ছাত্রনেতাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়। তবে আন্দোলনের গতি থামেনি। ভাষার প্রশ্নে সিলেটের ছাত্রসমাজ যে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে।
ভাষা আন্দোলন সিলেটের তরুণ প্রজন্মকে সংগঠিত ও সচেতন করে তোলে। পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের অংশগ্রহণে ১৯৫২ সালের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি নির্মাণের সূচনা; আর সেই প্রক্রিয়ায় সিলেটও ছিল সক্রিয় অংশীদার।
ভাষা আন্দোলনের প্রভাব শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি সাংস্কৃতিক চেতনায়ও গভীর রেখাপাত করে। সিলেটে সাহিত্যচর্চা, নাট্য আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ভাষার মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বাংলা ভাষার চর্চা ও প্রসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন উদ্যম সৃষ্টি হয়।
আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সিলেটবাসী গর্বের সঙ্গে স্মরণ করে সেই দিনটিকে। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি ভোরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। প্রভাতফেরি, আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানানো হয়।
ঢাকার রক্তক্ষয়ী ঘটনার প্রতিধ্বনি সেদিন সিলেটের রাজপথে যে প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছিল, তা প্রমাণ করে ভাষার প্রশ্নে এই জনপদও ছিল সমানভাবে সোচ্চার ও সংহত। হয়তো কেন্দ্রীয় ইতিহাসে সিলেটের ভূমিকা তুলনামূলক কম আলোচিত, কিন্তু বাস্তবতায় এই অঞ্চলের ছাত্রসমাজ ও নাগরিকরা ভাষার অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল।
তথ্যসূত্র
১. বদরুদ্দীন উমর, একুশে ফেব্রুয়ারি, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
২. বাংলা একাডেমি, ভাষা আন্দোলনের দলিলপত্র, বিভিন্ন খণ্ড, ঢাকা।
৩. “বাংলা ভাষা আন্দোলন,” বাংলা উইকিপিডিয়া।
৪. “Bengali Language Movement,” Wikipedia (English Edition)।
৫. Sylhet District Gazetteer, বাংলাদেশ সরকার প্রকাশনা।
৬. সিলেট অঞ্চলের ভাষা আন্দোলন বিষয়ক স্থানীয় স্মারকগ্রন্থ ও প্রবীণ ভাষাসংগ্রামীদের স্মৃতিচারণ।
সিলেট, একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২, ঢাকা, স্বাধীন বাংলাদেশ, ভাষা আন্দোলন