০৫ মে ২০২৬

দৈনন্দিন / গ্রামবাংলা

বর্ষায় নৌকা-শীতে সাঁকো, ঝুঁকি নিয়েই সুরমা পারাপার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:৪০ অপরাহ্ন


বর্ষায় নৌকা-শীতে সাঁকো। এই চক্রেই চলছে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার সুরমাপাড়ের অন্তত ১০-১২ গ্রামের মানুষের জীবন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নৌকা, বাঁশের সাঁকো আর ঝুঁকি-এই তিন সঙ্গী নিয়েই সুরমা নদী পার হতে হচ্ছে তাদের। একসময় একটা বাঁশের উপর ভর করে নদী পাড়ি দিতে হলেও সময়ের পরিক্রমায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। বাঁশের বদলে গেল দুই বছর ধরে নির্মাণ করা হচ্ছে কাঠের সাঁকো।

 

তবে বাঁশ কিংবা কাঠ দুটোতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও একটি স্থায়ী সেতুর স্বপ্ন আজও অধরা রয়ে গেছে দশ গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষের। শুধু তাই নয়, শুধু একটি সেতুর অভাবে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে সিলেটের সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ। সেতুটি হলে এই দুই উপজেলার সরাসরি যোগাযোগ যেমন সহজ হতো, তেমনি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও পেতো নতুন গতি। অথচ স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও সুরমা নদীর ওপর সেতু নির্মাণে আজও দেখা মেলেনি কার্যকর কোনো উদ্যোগের।

 

কানাইঘাটের লক্ষ্মীপ্রাসাদ পূর্ব ইউনিয়নটি যেন নদী আর পাহাড়ে ঘেরা এক দ্বীপ। দক্ষিণ ও পূর্বে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, উত্তরে জকিগঞ্জ, আর পশ্চিমে কানাইঘাট উপজেলা সদর। জকিগঞ্জের কাজলসার ইউনিয়নের আটগ্রাম এলাকা দিয়েই অন্তত ১০ গ্রামের হাজার হাজার মানুষের একমাত্র যাতায়াতের পথ। কিন্তু সুরমা নদীর ওপর একটি সেতু না থাকায় প্রতিদিনই তাদের পার হতে হয় ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে।

 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুরমার উত্তরপাড়ে কানাইঘাট উপজেলার কাড়াবাল্লা, কান্দিগ্রাম, বড়চাতল, মাজরগ্রাম, ফাটাউরা, এরালিগুল, দনা বাজার, সুরমা বাজার, বাকুড়ি, রাতাছড়া, খাশিয়াপুঞ্জি, রতনেরগুল, বালিছড়া, নগুড়িসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াত এ পথ দিয়ে। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষকে সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে জকিগঞ্জের আটগ্রাম এলাকা হয়ে জেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়। তাছাড়াও লোভাছড়া পাথর কোয়ারি, খাসিয়াপুঞ্জি থেকে পান সংগ্রহ, পাহাড়ি এলাকা থেকে কলা, কমলা, কাঁঠাল, লটকন ও পেয়ারাসহ নানা ফলমূল বিক্রি করতেও সুরমা পাড়ি দিয়ে আসতে হয় মানুষজনকে।

 

অন্যদিকে লক্ষ্মীপ্রাসাদ পূর্ব ইউনিয়নে খাসিয়াপুঞ্জি, পরিত্যক্ত পেট্রোবাংলা ও পাহাড়ি এলাকা ঘুরতে সারাবছর ওই এলাকায় যান পর্যটকরা। এতে করে এই ইউনিয়নের সঙ্গে মানুষের যাতায়াত অনেক বেশি। কিন্তু সুরমার ওপর সেতু না থাকায় মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই।

 

বড়চাতল গ্রামের মো. ফখর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও ভালো মাধ্যমিক বা কলেজ নেই। পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হলে সুরমা পার হওয়া ছাড়া উপায় নেই। বাচ্চাদের প্রতিদিন চোখের সামনে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে যেতে দেখতে খুব কষ্ট হয়।’

 

তিনি বলেন, ‘বয়স্ক মানুষ আর রোগীদের জন্য এই পারাপার আরও ভয়াবহ। অসুস্থ কাউকে জেলা শহরের হাসপাতালে নিতে হলে নৌকা বা নড়বড়ে সাঁকোই ভরসা। বহু দুর্ঘটনার গল্প ছড়িয়ে আছে নদীর দুই পাড়ে।’

স্কুল শিক্ষক আব্দুর রউফ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে সুরমার নদীর উপর একটি ব্রীজ নির্মাণের দাবি ১০ গ্রামের মানুষের। কিন্তু কেন ব্রীজ হচ্ছে না তা এখনও অস্পষ্ট। অসংখ্য বার ব্রীজ নির্মাণের জন্য জরিপ হয়েছে। কিন্তু বছর শেষে ফলাফল শূন্য।

 

তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র একটি ব্রীজের কারণে সুরমা নদীর দুইপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানের পার্থক্য দিন রাতের মতো। শিক্ষা, স্বাস্থ্য উন্নয়ন সবকছিুতেই পিছিয়ে পুরো একটি ইউনিয়ন। বর্তমান যুগে একটি ইউনিয়ন এভাবে অবহেলিত থাকবে, এটা অকল্পনীয়।’

 

বড়চাতল এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবি আব্দুল গনি বলেন, ‘আমাদের জন্মের আগেও নাকি এখানে সেতুর দাবি ছিল। এত বছরেও কিছু হলো না। মনে হয়, আমাদের কেউ নেই।’ সাবেক সংসদ সদস্যরাও বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি-যোগ করেন তিনি।

 

ঘাটের ম্যানেজার আলী আহমদ বলেন, ‘বাঁশের সাঁকোতে সবাই ভয় পায়, দুর্ঘটনাও হয়। তাই গতবারের মতো এবার কাঠের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে।

 

এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথের সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন বলেন, ‘সুরমা নদীর এই স্থানে নতুন সেতু নির্মাণের কোনো প্রস্তাব আমার যোগদানের পরে আসেনি। এর আগে কোনো প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সেটা সম্পর্কে আমার জানা নেই। এটা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।’


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

কানাইঘাট, ব্রীজ, সুরমা নদী, বাশের সাঁকো

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ