০৫ মে ২০২৬

দৈনন্দিন / মৃত‍্যু

জকিগঞ্জে নোমান হত্যা নিয়ে অভিযোগ—‘যারা হত্যাকারী, তারাই এখন বাদী ও সাক্ষী’

প্রতিনিধি, জকিগঞ্জ, সিলেট

প্রকাশঃ ৯ অক্টোবর, ২০২৫ ৭:২০ অপরাহ্ন

ছবিঃ ফাইল ছবি

সিলেটের জকিগঞ্জের কালিগঞ্জে বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী নোমান উদ্দিন হত্যা মামলায় নতুন  রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের ভাই রিয়াজ উদ্দিনের অভিযোগ, সন্দেহভাজন খুনীদের স্বজনকে বাদী ও সাক্ষী বানিয়ে মামলা রেকর্ড করায় ন্যায়বিচার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘যারা হত্যাকারী, তারাই এখন বাদী ও সাক্ষী।’

 

বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) নিহতের ভাই রিয়াজ উদ্দিন, চাচা বশির আহমদ চৌধুরী ও আত্মীয় আব্দুল মান্নান সিলেটের পুলিশ সুপার (এসপি) মাহবুবুর রহমানের কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। এ সময় তাঁরা মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। পুলিশ সুপার তাঁদের ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেন।

 

লিখিত অভিযোগে তারা উল্লেখ করেন, জকিগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাটি রহস্যজনকভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে। প্রায় ৩০ বছর প্রবাসে থাকার পর নোমান উদ্দিন দেশে ফিরে কালিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন নতুন বাড়িতে স্ত্রী, দুই কন্যা এবং শ্যালক হানিফ উদ্দিন সুমনসহ বসবাস শুরু করেন। নোমানের ক্রয়কৃত বাড়িটির অর্ধেক তাঁর স্ত্রীর নামে ও অর্ধেক নিজের নামে ছিল। 

 

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শ্যালক সুমন বাড়িটি নিজের নামে দলিল করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন। এ নিয়ে পারিবারিক বিরোধ চরমে পৌঁছালে একাধিকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ হলেও কোনো সমাধান হয়নি।

 

পরিবারের দাবি, এ বিরোধ নিয়েই ঘরে কলহ লেগে থাকত। এমনকি নোমান দ্বিতীয় বিয়ে করতে যাচ্ছেন এমন গুজব ছড়িয়ে শ্যালক সুমন পরিবারকে উত্তেজিত করে তোলে। 


তাদের দাবি, গত ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে হানিফ সুমন বাবুর বাজারের মাজেদ আহমদ ও বিয়ানীবাজারের তাছকিন আহমদ তাজুলসহ কয়েকজনকে নিয়ে নোমানকে দোকান থেকে বাড়িতে ডেকে আনেন। সেখানে জোর করে একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিতে চাইলে নোমান অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। পরে রাতে লাশ ঘরের বাথরুমে রেখে পরদিন ধানক্ষেতে ফেলে দেওয়া হয়।


এরপর শ্যালক সুমন ফেসবুকে ‘নোমান নিখোঁজ’ শিরোনামে পোস্ট দেন। ওই পোস্ট দেখে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে থানায় যোগাযোগ করেন। কিন্তু পুলিশ তাঁদের অভিযোগ নথিভুক্ত করেনি। ১ অক্টোবর ধানক্ষেত থেকে নোমানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।


নিহত নোমানের ভাই রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘ভাই নিখোঁজের ঘটনায় তাঁরা দু’দিন ধরে থানায় মামলা করার আবেদন করলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। এরপর ১ অক্টোবর ধানক্ষেত থেকে নোমানের লাশ উদ্ধার করা হয়।’

 

তার অভিযোগ, দাফনের পরদিন তিনি ও চাচা থানায় গিয়ে বাদী হয়ে মামলা করতে চান। কিন্তু এর পরদিনই রহস্যজনকভাবে তাদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে নোমানের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মুন্নিকে বাদী করে ‘অজ্ঞাত আসামি’ উল্লেখ করে মামলা রেকর্ড করা হয়। অথচ ঘটনার সময় ওই মেয়ে নিজেই বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন।

 

ঘটনার পর শ্যালক হানিফ আহমদ সুমনকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও তাকে মূল আসামি হিসেবে এফআইআরে নামোলে­খ করা হয়নি। একইভাবে ঘটনায় সরাসরি জড়িত বাবুর বাজারের মাজেদ আহমদ ও গোলাঘাট গ্রামের তাছকিন আহমদ তাজুলকেও আসামির তালিকায় রাখা হয়নি। নোমানের স্বজনরা জানান, জানাজার সময় শ্যালক সুমন, মাজেদ, তাজুলসহ সন্দেহভাজনরা পলাতক ছিলেন।

 

নিহতের ভাইয়ের দাবি, এখন পর্যন্ত সুমন ছাড়া অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার না করায় মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে আলামত নষ্ট করছে। আদালতে খুনি সুমনের জামিন আবেদনের সময় বাদিনী মেয়ে অনাপত্তি পেশ করতে যাচ্ছেন এমন তথ্য তাঁদের কাছে এসেছে। তাঁদের আশঙ্কা, হানিফ আহমদ সুমনের কাছ থেকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা না হলে মামলাটি ভেস্তে যেতে পারে এবং প্রকৃত খুনীরা পার পেয়ে যাবে।

 

তাঁরা বলেন, ‘যারা হত্যাকারী, তারাই এখন বাদী ও সাক্ষী। তারা নিহতের ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ের আড়ালে খুন থেকে রেহাই পেতে চায়।’

 

নোমান উদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা জানান, ‘আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই। খুনীদের স্বজনদের বাদী ও স্বাক্ষী বানিয়ে মামলা রেকর্ড করায় আমরা হতবাক। এই মামলার স্বচ্ছ তদন্ত না হলে নোমান হত্যার রহস্য চিরতরে চাপা পড়ে যাবে।’ 

 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, ‘সব দিক বিবেচনায় রেখেই পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ঘটনার সাথে জড়িতরা কোনভাবেই পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

জকিগঞ্জ হত্যা মামলা, নোমান উদ্দিন হত্যা, সিলেটের হত্যা রহস্য, জকিগঞ্জ ব্যবসায়ী খুন, সুনামগঞ্জ পুলিশ তদন্ত

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ