ডিজেল সংকটে বেড়েছে হারভেস্টারের ভাড়া, সংকটে হাওরাঞ্চলের কৃষক
কৃষি
প্রকাশঃ ১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:২৪ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম ধানভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। তবে প্রতি বছরই প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তা এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় অনেক সময় ধান পাকার আগেই তলিয়ে যায়। এতে কৃষকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় হাওরাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি ও বন্যা সহনশীল ধানের চাষ সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসেড হবিগঞ্জ ‘এনরিচ’ প্রকল্পের মাধ্যমে শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওর এলাকায় উন্নত জাতের ধানের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করেছে। প্রকল্পটি জাপানের শেয়ারদ্যা প্ল্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন ও জাপান ফান্ড ফর গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় পূর্ব পাগলা ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে আটজন কৃষকের জমিতে আটটি প্রদর্শনী প্লট গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি প্লটের আয়তন প্রায় এক বিঘা। এসব প্লটে বন্যা সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাতের ধান ব্রি ধান-৬৭, ব্রি ধান-৯২ এবং ব্রি ধান-১০৮ চাষ করা হচ্ছে।
প্রদর্শনী প্লটে অংশ নেওয়া কৃষকদের মধ্যে রয়েছেন মাহমুদপুরের ছাদিক মিয়া, আমরতলীর বেনু রঞ্জন দাস, পিঠাপইয়ের মতিউর রহমান, খুরিয়াইয়ের আব্দুস সবুর, শত্রুমর্দনের মনীন্দ্র সূত্রধর, ব্রাহ্মণগাঁওয়ের জাবেদ নূর, হাসনপুরের আবু মিয়া এবং নিদনপুরের রাশেদ আলী।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব প্লট শুধু উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়; বরং কৃষকদের জন্য একটি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে। জমি প্রস্তুত, উন্নত বীজ নির্বাচন, চারা উৎপাদন, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই দমন সব বিষয়ে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মাঠকর্মীরা নিয়মিত পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
উন্নত জাতগুলোর মধ্যে ব্রি ধান-৬৭ তুলনামূলক দ্রুত পরিপক্ব হয়, সাধারণত ১৪৫ থেকে ১৫০ দিনের মধ্যে। ফলে আগাম বন্যার আগে ফসল ঘরে তোলার সুযোগ থাকে। ব্রি ধান-৯২ কিছুটা দীর্ঘমেয়াদি হলেও উচ্চফলনশীল এবং প্রতিকূল পরিবেশেও ভালো ফলন দেয়। অন্যদিকে ব্রি ধান-১০৮-এর গাছ শক্ত হওয়ায় সহজে হেলে পড়ে না এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম।
মাঠপর্যায়ে এসব প্লট দেখে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই নিয়মিত এসে চাষাবাদের কৌশল পর্যবেক্ষণ করছেন। পিঠাপই গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান বলেন, আগে যে ধান করতাম, তা প্রায়ই বন্যায় নষ্ট হয়ে যেত। এখন স্বল্পমেয়াদি জাত চাষ করে সময়মতো ফসল কাটতে পারব বলে আশা করছি।
মাহমুদপুরের ছাদিক মিয়া জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ শিখে এবার ফলনের আশাও বেড়েছে। তিনি বলেন, “ঠিক সময়ে চারা রোপণ আর সঠিকভাবে সার প্রয়োগ করায় গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে এই জাতের ধান করব।”
এসেড হবিগঞ্জের প্রকল্প কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, হাওরাঞ্চলের বাস্তবতায় স্বল্পমেয়াদি ও বন্যা সহনশীল ধানের বিকল্প নেই। এনরিচ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের শুধু বীজ সরবরাহ নয়, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাওরে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে উন্নত জাতের ধান চাষ খুবই জরুরি। প্রদর্শনী প্লটগুলো সেই পরিবর্তনের একটি কার্যকর উদাহরণ।
হাওর, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ধান চাষ