ইংরেজি শেখার সেরা ৫ বই: ঘরে বসেই বাড়ান দক্ষতা
যাপিতজীবন
প্রকাশঃ ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৮:১৯ অপরাহ্ন
কোনো জায়গার আসল স্পন্দন বুঝতে হলে সেখানকার মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়। তাদের ঘরে রাত কাটাতে পারলে সেই অভিজ্ঞতা অনেক সময় আজীবনের বন্ধুত্বে রূপ নেয়। সিলেটের জাফলংয়ে খাসিয়া পুঞ্জির ভেতরে এখন ঠিক এমনই এক অভিজ্ঞতার জন্ম হচ্ছে।
জাফলং মানেই পর্যটকদের কাছে প্রবহমান নদী, পাথরের বিছানা আর মেঘালয়ের পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। এতদিন দর্শনার্থীরা সিলেট শহর থেকে জাফলং ঘুরে সন্ধ্যার আগেই ফিরে যেতেন। কিন্তু এ বছরের শুরু থেকে ছবিটা বদলাতে শুরু করেছে। পিয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত খাসিয়া পুঞ্জি এখন অতিথিদের জন্য খুলে দিয়েছে নিজেদের ঘরের দরজা।
এখন দর্শনার্থীরা পাহাড়ের নীরবতা উপভোগ করতে পারেন, সন্ধ্যায় খাসিয়া সংগীত শুনতে পারেন, ঘরোয়া খাবার খেতে পারেন, পুঞ্জিতে রাত কাটাতে পারেন—পর্যটক হিসেবে নয়, প্রায় একজন স্থানীয় মানুষের মতো করেই।
পুঞ্জিতে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাই আলাদা। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে খাসিয়া আতিথেয়তা। সেখান থেকে শুরু হয় হাঁটা পথ। বনের ভেতর দিয়ে সরু পথ, ফাঁক গলে নেমে আসে সূর্যের আলো। কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ে খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ঘরগুলোর সারি। অতিথিকে স্বাগত জানানো হয় পান-সুপারি ও ফুলের মালা দিয়ে।
পুঞ্জিটি পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। ঘরগুলো মাটি থেকে উঁচু করে বানানো—স্যাঁতসেঁতে আর পোকামাকড় এড়ানোর জন্য। ঘরে ঢুকলে দেখা যায় একটি বিছানা, টেবিল, বাতি, পাখা, সংযুক্ত বাথরুম—আর অবাক করার মতো বিষয় হলো কার্যকর ওয়াই-ফাই সংযোগ। অপ্রয়োজনীয় কিছু নেই, অথচ অভাবও নেই।
ব্যাগ রেখে বেরোতেই অপেক্ষায় থাকেন স্থানীয় একজন গাইড—অধিকাংশই তরুণ। শুরু হয় পুঞ্জি ঘোরা। খাসিয়া মিউজিয়াম, ঐতিহাসিক স্থান, প্রকৃতি—সবকিছুই ধীরে ধীরে খুলে পড়ে। কেউ চাইলে সাইকেল চালাতে পারেন, কেউ পিয়াইন নদীতে নৌকাভ্রমণ। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—গান, নৃত্য আর গল্পে ভরে ওঠে রাত।
বিশ্বজুড়ে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম (সিবিটি)। এখানে পর্যটনের আয় সরাসরি স্থানীয় মানুষের হাতে যায়। অতিথিরা থাকেন স্থানীয় পরিবারের ঘরে, সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন, কেনেন স্থানীয় পণ্য। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয় বাড়ে, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত থাকে।
খাসিয়া পুঞ্জিতে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উঠে আসে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। এখানে নারীরা পরিবার ও সম্পত্তির প্রধান অভিভাবক। অতিথিরা পরিবারের সঙ্গে বসে খাবার খান—বাংলা ও স্থানীয় পদ মিলিয়ে। আগুন জ্বালিয়ে সন্ধ্যার আড্ডায় শোনা যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা গল্প।
স্থানীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট কমিটি (ডিএমসি) পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করছে, হোমস্টের মান নিয়ন্ত্রণ করছে, পরিচ্ছন্নতা ও আয় বণ্টন নিশ্চিত করছে।
পর্যটকদের জন্য রয়েছে খাসিয়া মিউজিয়াম, বয়নকর্মশালা, জৈন্তা রাজবাড়ি ও নকশলার জমিদার বাড়ি। প্রকৃতিপ্রেমীরা দেখতে পারেন মায়াবী জলপ্রপাত, চা-বাগান, দাউকি নদীর স্বচ্ছ জল। আছে ট্রেকিং, সাইকেলিং, বাগান ঘোরা ও বনপথের অভিযান।
পর্যটক জান্নাতুল মাওয়ার জন্য এই ভ্রমণ ছিল বদলে দেওয়ার মতো। তিনি বলেন, “এটাই ছিল আমার প্রথম হোমস্টে অভিজ্ঞতা। ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে পড়া একটি জনগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে একই ছাদের নিচে থাকা—এটা ছিল অবিশ্বাস্য।”
তিনি আরও বলেন, “তাদের আন্তরিকতা আর গাইডদের সরলতা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। আর সেলফি জোন থেকে মেঘালয়ের পাহাড়ের দৃশ্য—এটা কখনো ভুলব না।”
জাফলং খাসিয়া পুঞ্জিতে হোমস্টে চালু হওয়ার পর গাইড, কারিগর, নৌকার মাঝি, রাঁধুনি—সবারই আয় হচ্ছে। যদিও আর্থিক হিসাব এখনো চূড়ান্ত নয়, তবে পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো।
ডিএমসি সভাপতি ও পুঞ্জিপ্রধান ওয়েলকাম লিম্বা বলেন, “দশকের পর দশক পর্যটক এলেও আমরা কিছু পাইনি। ৬৫টি বৈঠকের পর বুঝেছি—কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজমই আমাদের ভবিষ্যৎ।”
সরকার, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর সহায়তায় পরিচালিত প্রোগ্রেস প্রকল্প এই উদ্যোগকে সহায়তা করছে। এখন পর্যন্ত ১২ জন গাইড প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
আইএলও বাংলাদেশের কর্মকর্তা অ্যালেক্সিয়াস চিচাম বলেন, “স্থানীয়রা যাতে পর্যটন থেকে সত্যিকারের অর্থনৈতিক লাভ পায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।”
গাইড সেভেনলি খংস্টেই বলেন, “নদীর পাড় থেকেই আমাদের কাজ শুরু। আগে জানতাম না গাইডিং পেশা হতে পারে। এখন পরিবার চালাতে পারছি, আত্মবিশ্বাস পেয়েছি।”
এই পর্যটন উদ্যোগ দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ সুরক্ষায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ শুরু হয়েছে মৌলভীবাজার, শ্যামনগর ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকাতেও।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপপরিচালক কাবিল মিয়া বলেন, “খাসিয়াদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করাই আমাদের লক্ষ্য।”
যেখানে একসময় পর্যটক আসত, দেখত আর চলে যেত—সেখানে এখন থেকে যায়, শেখে, সম্পর্ক গড়ে তোলে। জাফলংয়ের খাসিয়া পুঞ্জিতে তাই ভ্রমণ মানে শুধু দেখা নয় ভাগ করে নেওয়া এক জীবনের গল্প।
[মূল প্রতিবেদক দ্য ডেইলি স্টারে ইংরেজিতে প্রকাশিত। প্রতিবেদনটি বাংলায় অনুদিত ও পরিমার্জিত।]
জাফলং, খাসিয়া পুঞ্জি, সিলেট, ভ্রমণ