দেড় যুগের ধারাবাহিকতা ভেঙে সিলেট বোর্ডে পাসের হারে বড় পতন
তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা
প্রকাশঃ ১০ আগস্ট, ২০২৬ ৪:৩১ অপরাহ্ন
সিলেট শিক্ষা বোর্ডে এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে বড় ধস নেমেছে। এ বছর বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সর্বশেষ ২০০৮ সালে পাসের হার ছিল ৫৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ।
তবে পাসের হার কমলেও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। এবার ৩ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬১৪। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ বেড়েছে ২২২টি।
সোমবার সকালে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সম্মেলনকক্ষে এসএসসি পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হয়। বোর্ডের সচিব চৌধুরী মামুন আকবর ফল ঘোষণা করেন। এ সময় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিন উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বোর্ডের এসএসসি ফলাফলে পাসের হার ছিল তুলনামূলকভাবে কম। ২০০১ সালে পাসের হার ছিল মাত্র ৩৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল মাত্র দুজন।
২০০২ সালে পাসের হার বেড়ে হয় ৪১ দশমিক ৯৭ শতাংশ, জিপিএ-৫ পায় ১৮ জন। ২০০৩ সালে পাসের হার ছিল ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ, জিপিএ-৫ পায় ১০ জন। ২০০৪ সালে পাসের হার ৫২ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পায় ৩৪৮ জন। ২০০৫ সালে পাসের হার আবার কমে দাঁড়ায় ৪৮ দশমিক ৪৭ শতাংশে; জিপিএ-৫ পায় ৪৭৩ জন।
এরপর ধীরে ধীরে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসে। ২০০৯ সালে পাসের হার এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮ দশমিক ৭১ শতাংশে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়ে হয় ১ হাজার ৮৯৬।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও পাসের হার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৮২ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৬ দশমিক ০৬, ২০২৪ সালে ৭৩ দশমিক ৩৫ এবং ২০২৫ সালে ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এবার তা আরও কমে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে নেমেছে।
অর্থাৎ গত পাঁচ বছর ধরেই সিলেট বোর্ডে পাসের হার কমার প্রবণতা ছিল। এবার সেই পতন আরও তীব্র হয়েছে।
পাসের হারে বড় ধস নামলেও জিপিএ-৫-এর চিত্র পুরোপুরি বিপরীত। এবার ৩ হাজার ৮৩৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর মধ্যে ছেলে ১ হাজার ৭৪৫ এবং মেয়ে ২ হাজার ৯১ জন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা অনেক এগিয়ে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৬০৮ জন। এর মধ্যে ছেলে ১ হাজার ৬৮৪ এবং মেয়ে ১ হাজার ৯২৪ জন।
মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১২০ জন। তাদের মধ্যে ছেলে ২৪ এবং মেয়ে ৯৬ জন। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০৮ জন; এর মধ্যে ছেলে ৩৭ এবং মেয়ে ৭১ জন।
গত কয়েক বছরের তুলনায় জিপিএ-৫-এর সংখ্যাও অবশ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২ সালে সিলেট বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৭ হাজার ৫৬৫ জন। ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৪৫২, ২০২৪ সালে ৫ হাজার ৪৭১ এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৬১৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেখা গেছে মানবিক বিভাগে। এই বিভাগে পাসের হার ৪৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের চেয়ে ফেল করেছে বেশি শিক্ষার্থী।
মানবিক বিভাগে এবার ৫৭ হাজার ৭৬০ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ২৭ হাজার ৮১৫ জন এবং ফেল করেছে ২৯ হাজার ৯৪৫ জন। ছেলেদের পাসের হার ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ, আর মেয়েদের ৫০ দশমিক ২৯ শতাংশ।
অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৩২ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৩ শতাংশ।
বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় সামগ্রিক ফলাফলে এর প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের এসব বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়া দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতিও ফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।
সামগ্রিক ফলাফলে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। এবার মেয়েদের পাসের হার ৫৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ, আর ছেলেদের ৫৬ দশমিক ১২ শতাংশ।
বোর্ডে এবার মোট ৮৯ হাজার ৬৮৬ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। তাদের মধ্যে ৮৯ হাজার ৭৯ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। উত্তীর্ণ হয়েছে ৫১ হাজার ৯৫৭ জন।
পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৯ হাজার ৮৮৯ জন ছেলে এবং ৩২ হাজার ৬৮ জন মেয়ে।
পাসের হার কমে যাওয়ার বিষয়ে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিন বলেন, এবার পরীক্ষার্থীদের দুই বছরে দুই ধরনের সিলেবাসে পড়তে হয়েছে। এর প্রভাব ফলাফলে পড়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও ইংরেজি ও গণিতে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় পরীক্ষা কঠোরভাবে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল। এ ছাড়া ইংরেজি ও গণিতে দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতিও রয়েছে। দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা গেলে ফলাফল আরও ভালো করা সম্ভব।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীন চার জেলার মধ্যে পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে সিলেট জেলা। এ জেলায় পাসের হার ৬৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এরপর মৌলভীবাজারে ৫৭ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং সুনামগঞ্জে ৫৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাসের হার হবিগঞ্জে, ৫৬ দশমিক ৯২ শতাংশ।
সিলেট জেলায় ৩৫ হাজার ২৪০ জন পরীক্ষা দিয়ে ২২ হাজার ১৬০ জন পাস করেছে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ২৩ জন। মৌলভীবাজারে ১৯ হাজার ৮৫৬ জনের মধ্যে ১১ হাজার ১০৩ জন পাস করেছে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭২৫ জন। সুনামগঞ্জে ১৮ হাজার ২৮৯ জনের মধ্যে ৯ হাজার ৯৯৯ জন পাস করেছে। হবিগঞ্জে ১৫ হাজার ৬৯৪ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে ৮ হাজার ৬৯৫ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৭৫ জন।
এবার সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল সাতটি। তবে এবার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেনি। সব মিলিয়ে, একদিকে পাসের হার নেমে গেছে ১৮ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, অন্যদিকে জিপিএ-৫ কিছুটা বেড়েছে।
সিলেট শিক্ষা বোর্ড, এসএসসি ফলাফল ২০২৬, সিলেট এসএসসি ফল, ১৮ বছরে সর্বনিম্ন পাসের হার, এসএসসি পাসের হার, সিলেট বোর্ডের ফলাফল, জিপিএ-৫