শিক্ষিকার রিল ভিডিও নিয়ে বিতর্ক: সরকারি চাকরিবিধি কী বলে?
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ২৭ জুলাই, ২০২৬ ২:২২ অপরাহ্ন
সিলেটের এক প্রধান শিক্ষকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা একটি রিল ভিডিও ঘিরে বিতর্কের মধ্যে ঘটনাটি তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা বিভাগ। তবে ভিডিওটিতে কোনো অন্যায় দেখছেন না প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তার ভাষ্য, গান গাওয়া বা এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করাকে তিনি অন্যায় মনে করেন না।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল সম্প্রতি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন। ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডের ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানের সঙ্গে ধারণ করা ওই ভিডিওতে তাকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হাঁটতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষ তাকে নিয়ে সমালোচনা ও ট্রল শুরু করে। পরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
তবে সমালোচনার পাশাপাশি বিউটি রানী পালের পাশে দাঁড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেক শিক্ষকই একই ধরনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানের সঙ্গে ভিডিও তৈরি করে বিউটি রানীর প্রতি সংহতি জানাচ্ছেন।
এমনই একটি ভিডিও প্রকাশ করে শিক্ষক দীপা মণ্ডল ফেসবুকে লেখেন, শিক্ষকদের নাচ, গান, অভিনয়সহ নানা দক্ষতায় পারদর্শী হতে বলা হয়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরে রাখতে শিক্ষকদের নানা সৃজনশীল পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। অথচ একজন শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে আনন্দের একটি মুহূর্ত প্রকাশ করলেই সেটিকে নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। শাড়ি পরা একজন শিক্ষকের সাধারণ হাঁটার ভিডিওকে অশ্লীলতার সঙ্গে যুক্ত করারও সমালোচনা করেন তিনি।
তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত
বিতর্কের মধ্যে শিক্ষা বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ধারণ করা ভিডিওটি সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা যাচাই করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল মোল্লা বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তদন্তে আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনো বিষয় পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদও বলেন, সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশনা লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।
‘গান গাওয়াকে আমি অন্যায় মনে করি না’
রোববার সিলেটে একটি কর্মশালায় অংশ নিতে এসে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেন, ভিডিওটি তিনি নিজে দেখেননি। কারণ তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন না। তবে অন্যদের কাছ থেকে জেনেছেন, ভিডিওটিতে কোনো অশ্লীলতা নেই। তার ভাষায়, ‘গান গাওয়া বা এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করাকে আমি অন্যায় মনে করি না। কেউ একমত হোক বা না হোক, আমার অবস্থান সেটিই।’
‘সংকীর্ণ মানসিকতা নিয়ে এগোনো সম্ভব নয়’
বিউটি রানী পাল বলেন, আলোচিত ভিডিওটি বিদ্যালয়ের ছুটির পর তার এক সহকর্মী ধারণ করেছিলেন।
ভিডিওটি নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, একদিকে আধুনিক ও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা হবে, অন্যদিকে চিন্তা-চেতনায় সংকীর্ণতা থাকলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।
নিজের পাশে দাঁড়ানো শিক্ষকসহ সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আপাতত বিস্তারিত মন্তব্য করবেন না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই পরবর্তী সময়ে কথা বলবেন।
বিউটি রানী পাল আরও বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ ও হেনস্তা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
জেলা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী বিউটি রানী পাল ২০১৬ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। চলতি বছর তিনি সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন।
তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা, নাচ-গানের মাধ্যমে পাঠদান, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক ওই রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করেই বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
বিউটি রানী পাল, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেট, রিল ভিডিও বিতর্ক, প্রধান শিক্ষক, ববি হাজ্জাজ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, তদন্ত কমিটি, শিক্ষা বিভাগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম