২৪ জুন ২০২৬

দৈনন্দিন / গ্রামবাংলা

হাওরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ, ‘পেটে ভাত দেবেন কে’ প্রশ্ন জেলেদের

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ২৪ জুন, ২০২৬ ১২:৫৩ অপরাহ্ন


প্রজনন মৌসুমে মাছের নিরাপদ বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে প্রথমবারের মতো এক মাসের জন্য মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে প্রশাসন। গত ২৯ মে থেকে শুরু হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা চলবে আগামী ২৮ জুন পর্যন্ত। তবে বিকল্প কর্মসংস্থান, খাদ্য সহায়তা কিংবা নগদ প্রণোদনা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় হাওরপাড়ের হাজারো মৎস্যজীবী পরিবারে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ ও অসন্তোষ।

জীবিকার তাগিদে অনেক জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এখনও হাওর-বাওর, নদী-নালা ও খাল-বিলে মাছ ধরছেন। মাছ আহরণ ঠেকাতে প্রশাসন বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। অভিযানে জরিমানা আদায় এবং মাছ ধরার সরঞ্জাম জব্দ করা হচ্ছে। ফলে একদিকে প্রশাসনিক কড়াকড়ি, অন্যদিকে জীবিকার সংকটে পড়েছেন মৎস্যজীবীরা।

হাওরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, হেমন্ত মৌসুমে কৃষিকাজ এবং বর্ষাকালে মাছ শিকারই অধিকাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। বর্ষার সময় বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজের সুযোগ থাকে না বললেই চলে। তখন মাছ আহরণ করেই সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সামাজিক নানা দায়িত্ব পালন করেন তারা।

এ বছর অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যায় হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেক পরিবার আগেই অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরপারের গোলাবাড়ি গ্রামের জেলে মকবুল হোসেনের পরিবারে সদস্য সংখ্যা আটজন। বর্ষা মৌসুমে মাছ ধরেই সংসার চালান তিনি। মাছ ধরা নিষিদ্ধের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সরকার মাছ মারা নিষেধ করছে। কিন্তু পেটে তো ভাত দিতে হবে। সরকার যদি সাহায্য করত, তাহলে মাছ ধরতে হাওরে যেতাম না। আমরা গরিব মানুষ, মাছ না মেরে কী করব? দুই-চার কিয়ার জমি করছিলাম, সেটাও পানিতে ডুবে গেছে।”

একই গ্রামের পাশের পীরেরগাঁওয়ের মৎস্যজীবী আব্দুল হক বলেন, “আমরা টাঙ্গুয়ার পাড়ের মানুষ। মাছ মেরেই খেতে হবে। ফসল নষ্ট হয়েছে, রোজগারের কোনো পথ নেই। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে মাছ ধরতে হয়। অন্য কোনো উপায় নেই।”

তবে সচেতন মহল বলছে, মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা সময়োপযোগী হলেও দরিদ্র জেলেদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি না থাকায় এর সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হবে।

সুনামগঞ্জের কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি পরিষদের সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী আমজাদ বলেন, “নিষিদ্ধ জাল ও চাঁই ব্যবহার করে যেভাবে মাছ নিধন হচ্ছে, তাতে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দরিদ্র জেলেদের রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন মাছ ধরা। তাই তাদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।”

জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, আমাদের প্রধান জীবিকা মাছ ও ধান। হাওরে ধানের উৎপাদন বাড়লেও মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। তাই মাছের প্রজনন রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু কোনো সহায়তা ছাড়া জেলেদের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ করে দেওয়া এক ধরনের অবিচার। মাছ রক্ষার পাশাপাশি জেলেদের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।

সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি অধ্যুষিত এ জেলায় ৯৫টি হাওর, ২৬টি নদী, ১ হাজার ৩৫টি বিল ও জলমহাল রয়েছে। জেলায় নিবন্ধিত মৎস্যজীবীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার। এছাড়া রয়েছে ৬৩০টি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। বর্ষা মৌসুমে এসব মৎস্যজীবীর বড় অংশ মাছ আহরণ ও বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আল মিনান নূর বলেন, হাওরাঞ্চলে প্রথমবারের মতো এক মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে আইন বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। এর ফলে মাছ নিরাপদে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ পাবে। মাছ বড় হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা ভবিষ্যতে জেলেদের জন্যই লাভজনক হবে।

প্রণোদনার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্ষাকালে এখানকার মানুষের মাছ ধরা ছাড়া কাজের সুযোগ সীমিত এটি সত্য। হতদরিদ্র জেলেরা কীভাবে চলবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রণোদনার প্রস্তাব পাঠিয়েছি। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ, হাওর, মৎস্য, জেলে

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ