
হাওর–ভাটির দুর্গম জনপদ দিরাই ও শাল্লা উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ–২ আসনের রাজনীতিতে একটি নাম আজও অনিবার্য প্রয়াত বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। রক্তমাংসের শরীর নিয়ে তিনি আর মাঠে নেই, আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও বর্তমান বাস্তবতায় স্থগিত। তবু এবারের জাতীয় নির্বাচনে এই আসনের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে বারবার ফিরে আসছে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম।
হাওরের প্রতিকূল স্রোত পেরিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ক্যারিশমাটিক নেতা হিসেবে। উপমহাদেশের বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় টেকেরঘাট সাবসেক্টরের প্রতিষ্ঠাতা অধিনায়ক হিসেবে তার ভূমিকা আজও স্মরণীয়। দিরাই–শাল্লার মানুষ তাকে সাতবার বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে পাশের আজমিরিগঞ্জ আসন থেকে উপনির্বাচনে এমপি হয়ে মোট আটবার সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী ড. জয়া সেনগুপ্তাও দুইবার এমপি নির্বাচিত হন। সে কারণেই সুনামগঞ্জ–২ আসনকে দীর্ঘদিন ধরে ‘সুরঞ্জিতের ঘাঁটি’ হিসেবে দেখা হয়।
বর্তমান নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ মাঠে কার্যত অনুপস্থিত। দলীয় নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে সক্রিয় নন। কিন্তু এই শূন্যতায়ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রাজনৈতিক প্রভাব মিলিয়ে যায়নি। বরং ভিন্ন বাস্তবতায় বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরাই তার অবদান তুলে ধরে ভোটের মাঠে কথা বলছেন।
দিরাই ও শাল্লা মিলিয়ে এই আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৬ হাজার ৪৮ জন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক ভোটার হিন্দু সম্প্রদায়ের। বিএনপির প্রার্থী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনিও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বহু নির্বাচনে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হলেও ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে পরাজিত করে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেন তিনি।
এবার বয়সের কারণে নাছির উদ্দিন চৌধুরী নিয়মিত মাঠে নামতে না পারলেও তার পক্ষে দুই উপজেলার কর্মী–সমর্থকেরা সক্রিয়। বড় সমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখছেন। একই সঙ্গে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সমাবেশগুলোতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রশংসা উঠে আসছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি তার ব্যক্তিগত আইডিতে দেওয়া আবেগঘন এক পোস্টে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। নির্বাচনী সমাবেশে তার মৃত্যুবার্ষিকীতে এক মিনিট নীরবতাও পালন করা হয়েছে।
জামায়াত মনোনীত প্রার্থী, সিলেট বিভাগের আলোচিত নেতা এডভোকেট শিশির মনিরও একইভাবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে স্মরণ করেছেন। হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন, রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে তার অবদানের কথা তুলে ধরেছেন তিনি ও তার অনুসারীরা।
শাল্লা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. আবুল কাহের বলেন, ‘সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ। বারবার এমপি নির্বাচিত হয়ে তিনি এই এলাকার অহংকারে পরিণত হয়েছেন। গুণী মানুষকে স্মরণ করা আমাদের দায়িত্ব।’
বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো ছিল। তিনি আমাদের এলাকাকে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। এমন একজন রাজনীতিককে স্মরণ করা আমাদের কর্তব্য।’
শেয়ার করুনঃ
নির্বাচন থেকে আরো পড়ুন
সিলেট, সুনামগঞ্জ, দিরাই-শাল্লা, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত


