সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল ঘোষণা, ভোট ১২ মে
নির্বাচন
প্রকাশঃ ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ৩:১৮ অপরাহ্ন
সিলেট বিভাগে বিএনপি মনোনীত একমাত্র নারী প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনার নির্বাচনী প্রচারণায় জাতীয় পর্যায়ের নেতা দূরের কথা, জেলা পর্যায়ের বড় নেতাদেরও কেউ নেই। এমনকি উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতা অনুপস্থিত।
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ–ওসমানীনগর) আসনের প্রার্থী হিসেবে ‘গুম’ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী লুনা লড়ছেন মূলত তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে।
গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনী প্রচারণায় তাহসিনা রুশদীর লুনার বিভিন্ন জনসভা ও পথসভা পর্যালোচনা এবং বৃহস্পতিবার লুনার নির্বাচনী প্রচারণা পরিদর্শনে এ চিত্র উঠে আসে।
যদিও বড় নেতাদের পাশে না থাকাকে তৃণমুল নেতৃবৃন্দকে সুযোগ করে দেয়ার কৌশলগত কারণ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের এ উপদেষ্টা। তবুও স্থানীয় রাজনীতি বোঝেন এমন ব্যক্তিরা বিষয়টিকে দেখছেন অন্য দৃষ্টিতে।
মূলত তাহসিনা রুশদীর লুনার বিপরীতে বিএনপির বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির বলয়ের প্রভাব এ অবস্থার জন্য দায়ী বলে মনে করছেন তারা।
এই আসনের বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে একটি সৌজন্যতা নিয়ে আসতে প্রার্থীকে সাথে নিয়ে দুইপক্ষের নেতাদের গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) একটি জরুরি বৈঠক করেন বিএনপির সিলেট জেলা নির্বাচন সমন্বয়ক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
লুনা ছাড়াও এ ৩ লক্ষ ৬৪ হাজার ৮৩ ভোটারের এ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন খেলাফত মজলিসের মুনতাসির আলী, ইসলামী আন্দোলনের আমির উদ্দিন, জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ও গণফোরামের মুজিবুল হক।
২০১৮ সালের নির্বাচনেও বিএনটির মনোনয়ন পেয়েছিলেন লুনা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাওয়া এই আসনে যুক্তফ্রন্ট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন গণফোরামের মোকাব্বির খান।
সেই নির্বাচনের সময় থেকে স্থানীয় রাজনীতি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন লুনা। পরবর্তীতে ইলিয়াস-লুনা দম্পতির ছেলে আবরার ইলিয়াসও যুক্ত হয়েছেন রাজনীতিতে।
এম ইলিয়াস আলীর জনসমর্থনের কারণে স্থানীয় রাজনীতিতে লুনার প্রায় ৮ বছরের প্রভাব প্রথম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গতবছরের আগস্টের দিকে যখন বিএনপি তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সিলেট-২ আসনে বিএনপির মনোনয়নের ঘোষণা দেন।
স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্তদের একটি অংশ হুমায়ুন কবিরকে সমর্থন দিলে বিশ্বনাথ-ওসমানীনগরের রাজনীতিতে ইলিয়াস আলীর বলয় ভেঙে নতুন একটি বলয় সৃষ্টি হয়।
দুই বলয়ের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছালে ৯ অক্টোবর রাতে বিশ্বনাথ উপজেলা সদরে দুইপক্ষের সমর্থককের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। আহত হন উভয় পক্ষের কর্মীরা।
এ ঘটনার পর ২২ অক্টোবর হুমায়ুন কবিরকে বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়) হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাহসিনা রুশদীর লুনাকে দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয় বিএনপি।
প্রতীক বরাদ্দ শেষে ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামেন লুনা। প্রথম থেকেই দুই উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিন দুটি করে জনসভা করছেন লুনা।
এসকল জনসভায় তিনি বিগত আওয়ামী শাসনামলের নির্যাতন ও অত্যাচারের বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। তারপর তার নিখোঁজ স্বামী এম ইলিয়াস আলীর প্রসঙ্গে এলাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁর স্বপ্ন– উন্নত বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলা গড়তে ভোটের মাধ্যমে ধানের শীষকে বিজয়ী করার আহবান জানান।
তবে তার প্রতিটি সভা পর্যালোচনা করে দেখা যায় সেসকল সভায় জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের দুয়েকজন নেতা ছাড়া প্রায় সকল নেতাই অনুপস্থিত যারা সিলেটের আরো ৪টি আসনে যেখানে সরাসরি বিএনপির প্রার্থী আছেন, সেখানে উপস্থিত থাকছেন নিয়মিত।
ওসমানীনগরের সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান গয়াস মিয়া বলেন, ‘এটা ব্যক্তি পছন্দের বিষয় নয়, আমরা সবাই চাই ধানের শীষ জয়ী হোক। আমাদের নেতা হুমায়ুন কবিরও আমাদের সেভাবেই নির্দেশনা দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু প্রতিপক্ষ জামায়াত নিজে প্রার্থী না দিয়ে তার জোটসঙ্গী খেলাফতকে আসনটি ছেড়ে দিয়েছে, তাই দলের নেতৃবৃন্দ এই আসনে জয়ের ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিত। তাই অনেকেই নিয়মিত জনসভায় যোগ দিচ্ছেন না। তবে তিনি (লুনা) আমাদের ডাকলে আমরা অবশ্যই জনসভায় অংশ নিবো।’
তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, ‘আমার সমর্থক এবং দলের নেতাকর্মীরা যেভাবে কাজ করছেন তাতে আমি সন্তুষ্ট। যেহেতু নির্বাচন এলাকাভিত্তিক, তাই জেলা বা জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে জনসভা করলে তারা বক্তব্য দিবেন হয়তো, কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ হয়না।’
তিনি বলেন, ‘জনগন নির্বাচনের আগে অন্যদের বক্তব্য নয় বরং প্রার্থীর কথা শুনতে চান। জেলা পর্যায় থেকে জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ আমার সাথে যুক্ত হতে যোগাযোগ করেছেন কিন্তু আমি লোকদেখানো জনসভা আয়োজন না করে ইলিয়াস আলীর সমর্থক তৃণমূল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’
হুমায়ুন কবির বলয়ের প্রভাবে স্থানীয় নেতাদের অনেকেরই তার জনসভায় না আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখানে কোন বলয় নেই। চার-পাঁচজন সাবেক চেয়ারম্যান যারা একসময় ইলিয়াস আলীর নাম নিয়েই নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারাই কেবলমাত্র আমার সাথে নেই। তবে এটি তৃণমূলে কোন সমস্যা নয়।’
এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘এই আসনের যারা বহিষ্কৃত নেতৃবৃন্দ ছিলেন, তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে যাতে তারা দলের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেন। তারপরও প্রার্থীর পক্ষে প্রচারনায় বেশ কয়েকজনের অনাগ্রহের বিষয়ে জানতে পেরে বৈঠক আহবান করেছি সমস্যা সমাধানে।’
তিনি বলেন, ‘প্রার্থীর সাথে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে। নারী প্রার্থী হিসেবে তিনি কোন বৈষম্য বা সমস্যার শিকার হচ্ছেন না, সে বিষয় আমরা নিশ্চিত করছি।’
সিলেট-২, তাহসিনা রুশদী লুনা, ইলিয়াস আলী