১৭ এপ্রিল ২০২৬

নির্বাচন / জাতীয় সংসদ নির্বাচন

সুনামগঞ্জ-৩ আসন

জামায়াত জোটের ‘অনৈক্যে’ এগিয়ে বিএনপি প্রার্থী

প্রতিনিধি, শান্তিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬ ৭:১৬ অপরাহ্ন


আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ (শান্তিগঞ্জ–জগন্নাথপুর) আসনে সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের মাঠে মূল লড়াইয়ের আভাস মিলছে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির বহিষ্কৃত বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং জোটের একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকায় সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী- এমনটাই ধারণা করছেন স্থানীয়রা।

 

আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় নির্বাহি কমিটির সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ। বিপরীতে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তালা প্রতিকে নির্বাচনে নেমেছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

 

এদিকে ওই দুই প্রার্থী ছাড়াও নির্বাচনি প্রতিযোগীতার দৌঁড়ে রয়েছেন ১১ দলীয় জোটের শরিক আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম (ঈগল প্রতীক)। আসনটিতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ মুশতাক আহমদও (দেয়াল ঘড়ি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহিনুর পাশা চৌধুরী (রিকশা)।  মাঠে কাজ করছেন আরও দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহফুজুর রহমান খালেদ (টেবিল ঘড়ি প্রতীক) এবং হোসাইন আহমদ (ফুটবল প্রতীক)। 

 

আসনটিতে বিএনপি প্রার্থী কয়ছরকে বিজয়ী করতে একসাথে মাঠে কাজ করছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি আনছার উদ্দিন এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফারুক আহমদ। স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতিতে এই দুই নেতার প্রভাব উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে জগন্নাথপুর উপজেলায় প্রার্থীর নিজ এলাকা হওয়ায় সেখানেও ভালো সাড়া পাচ্ছেন কয়ছর আহমদ। তাঁর পক্ষে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মঈন মল্লিক মইন উদ্দিন সুহেলসহ একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

 

একই সাথে কয়ছর আহমদের পক্ষে ইতিমধ্যে একাত্মতা জানিয়ে প্রচারণায় অংশ নিয়েছে বিএনপি জোটের শরিক ইসলামপন্থী দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। দলটির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা তৈয়্যবুর রহমান চৌধুরী কয়ছর আহমদের পক্ষে নির্বাচনী সভায় অংশ নিয়ে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীককে বিপুল ভোটে বিজয়ী করতে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া প্রবাসী অধ্যুষিত এই এলাকার অসংখ্য নেতাকর্মী বিশেষত যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা দেশে এসে কয়ছর আহমদের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। 

 

কয়ছর আহমদ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ, গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। সুশৃঙ্খল প্রচারণায় ব্যাপক সাড়া ফেলছেন তিনি। এছাড়া আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় এই আসনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের অধিকাংশ ভোট পাবেন কয়ছর আহমদ এমন আভাসও মিলছে৷ চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির কাছেই নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন তারা। 

 

অপরদিকে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে কাজ করছেন ব্যারিষ্টার আনোয়ার হোসেন। তাঁর সাথে মাঠে কাজ করছেন বিএনপি থেকে মনোনয়ন চেয়ে বঞ্চিত হওয়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর আশফাক সামি, যুক্তরাজ্য বিএনপি নেতা এম. এ কাহার। এছাড়া আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানতে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী এম এ মান্নানের সমর্থন রয়েছে বলে প্রচার করছেন আনোয়ার হোসেন। পাশাপাশি দুই উপজেলার আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ রাখছেন তিনি। তবে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী না থাকায় ভোটের মাঠে এর প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীরা। 

 

এই আসনে জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট ইয়াসিন খাঁনের শক্ত অবস্থান থাকলেও জোটের সমঝোতার কারণে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন তিনি। জামায়াত প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও আসনটিতে উন্মুক্তভাবে লড়ছেন জোটের অপর তিন শরিক আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) মনোনিত প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম (ঈগল), খেলাফত মজলিসের শেখ মুশতাক আহমদ (দেওয়াল ঘড়ি) এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহিনুর পাশা চৌধুরী (রিকশা)। এরমধ্যে ডামি নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় শাহিনুর পাশার বিরুদ্ধে একাট্টা জোটের সকল দল ও কর্মী সমর্থকরা। 

 

জানা গেছে, শাহিনুর পাশাকেই একক প্রার্থী হিসেবে দিতে চেয়েছিল ১১ দলীয় জোট। কিন্তু জামায়াতসহ জোট শরিক দলের তীব্র আপত্তির মুখে শাহিনুর পাশার পাশাপাশি জোটের শরিক আরো দুই দলের প্রার্থীর জন্য আসনটিকে উন্মুক্ত রাখা হয়। এই দ্বন্দ্বে জামায়াত কোনো পক্ষকেই প্রকাশ্য সমর্থন না দেওয়ায় ব্যাকফুটে আছে ১১ দলীয় জোট। এই সুযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিষ্টার আনোয়ার হোসেনের দিকে ঝুঁকছেন জামায়াতের অনেক কর্মী-সমর্থক। তবে জামায়াতের বড় একটি অংশ এখনও দোদুল্যমান রয়েছেন। 

 

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শাহিনুর পাশা চৌধুরী স্বীকার করেছেন, জোটের তিনজন প্রার্থী থাকায় জামায়াত নীরব আছে। ফলে তাদের প্রচারণা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে আগামী ১ ফেব্রুয়ারীর মধ্যে সারাদেশের ১৭ টি উন্মুক্ত আসন থেকে একজন করে প্রার্থী রেখে সেই প্রার্থীর পক্ষে জোটের সবাইকে কাজ করার নির্দেশনা আসতে পারে বলেন তিনি। জোটের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকলে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। 

 

অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের শেখ মুশতাক বলেন, ‘জোটের তিনজন প্রার্থীর কারণে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। শাহিনুর পাশা ছাড়া অন্য যেকোনো প্রার্থীকে জোটের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে রাখলে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন বলে মনে করেন তিনি। এক্ষেত্রে নিজেকে সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী মনে করেন শেখ মুশতাক আহমদ। 

 

তবে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম বলছেন ভিন্ন কথা। জোটের একাধিক প্রার্থী থাকাকে সমস্যা হিসেবে দেখছেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার ভোট ১১ দলীয় জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমার নিজস্ব একটা ভোট ব্যাংক আছে। আমার ভোট তরুণদের ভোট, হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভোট। আমার ভোট ফুলতলী মাসলাখের ভোট। আমার ভোট পীর-মুরিদের ভোট। শাহিনুর পাশা ভাইয়ের ভোট কওমী অঙ্গনের ভোট। আর মুশতাক ভাইয়ের ভোট কি আছে তা আমি জানি না। তারা থাকায় আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না, কিন্তু তারা হয়তো সমস্যায় আছেন।’ 

 

সৈয়দ তালহা বলেন, ‘আমি যদি মাঠে না থাকি তাহলে আমার ভোট জোটে যাওয়ার কথা না, হয়তো ধানের শীষে চলে যাবে। আমি থাকায় হয়তো ধানের শীষের প্রার্থীর সমস্যা হচ্ছে। আমার জোটের অন্যান্য যে প্রার্থী আছেন তারা কওমি ঘরানার প্রার্থী। কিন্তু আমি হলাম সম্পূর্ণ বিপরীতমূখী একটি স্যেকুলারপন্থি দলের প্রার্থী। আমরা ছাত্র-জনতার দল।’

 

তবে জোটের অন্যতম বৃহৎ দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াত একক কোনো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন না। তাদের সিদ্ধান্ত হল জোটের তিন প্রার্থীর মধ্যে যে কাউকে পছন্দমতো ভোট দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে দলটির ৭৫ ভাগ নেতাকর্মী আমার পক্ষে কাজ করছেন। সর্বোপরী সকল অঙ্গনের ভোটার আমাকে সমর্থন দিচ্ছেন। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।’  

 

বিএনপির প্রার্থী কয়ছর এম আহমদ বলেন, ‘বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মানুষ তার পছন্দের প্রতিক ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। দুই উপজেলায় বিএনপির গণজোয়ার চলছে। আমি বিশ্বাস করি আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারী সারা দেশের মত সুনামগঞ্জ-৩ আসনেও ধানের শীষ প্রতিককে মানুষ ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করবে। এবং ৩১ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’


শেয়ার করুনঃ

নির্বাচন থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ-৩, নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচন

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ