১৮ এপ্রিল ২০২৬

নির্বাচন / জাতীয় সংসদ নির্বাচন

সিজিএসের গোলটেবিল বৈঠক

ভয়মুক্ত ভোটাধিকার নিশ্চিত না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬ ৪:০৮ অপরাহ্ন

ছবিঃ সিজিএসের গোলটেবিল বৈঠক

ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার নিশ্চিত করা না গেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র কেবল বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার প্রতিনিধিরা। 

তারা বলেন, নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে শুধু ভোটব্যাংক হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে না।

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে সিলেট নগরের নির্ভানা ইন হোটেলে ‘কাউন্টিং এভরি ভয়েস: মাইনরিটি পার্টিসিপেশন অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব বাংলাদেশ’স ডেমোক্রেসি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। এতে নাগরিক সমাজ, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, চা–শ্রমিক, দলিত ও তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আলোচনার শুরুতে সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে গণতন্ত্রের একটি মূল সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, কোনো পার্শ্ব বিষয় হিসেবে নয়।’

তিনি বলেন, ‘দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ সংখ্যালঘু হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার ও কর্মসূচিতে তাদের বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পায় না। নির্বাচনের সময় তাদের ভোটব্যাংক হিসেবে দেখা হলেও নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় দৃশ্যমান উদ্যোগ খুবই সীমিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি কাঠামোগতও। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষ প্রতিদিনই অনিশ্চয়তা, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করেন। নির্বাচনের সময় এসব ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন শুধু ভোট দেওয়ার সুযোগ নয়; ভয়, চাপ ও হুমকিমুক্ত পরিবেশে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও এর অপরিহার্য অংশ।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সিলেট মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর বলেন, ‘স্বাধীনতার পর তাঁরা আশা করেছিলেন হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান ও খ্রিস্টান সবাই মিলে একটি সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন। কিন্তু সেই আশা আজও পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন-প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।’

তিনি অভিযোগ করেন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হিন্দু ও বৌদ্ধদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি দীপু চন্দ্র দাস, মুনির চক্রবর্তী ও রানা প্রসাদ বৈরাগীর মতো মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।’

তিনি বলেন, দেশে এক ধরনের ‘মব কালচার’ গড়ে উঠেছে, কিন্তু মব কখনো ন্যায়বিচার হতে পারে না। প্রশাসনের কাছে গেলে প্রায়ই বলা হয়, ‘দেখছি’, কিন্তু কার্যকর সমাধান আসে না।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরীন হক বলেন, নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব জাতীয় সংসদে অত্যন্ত সীমিত। এটি শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জও বটে।

তিনি বলেন, নারী কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে নৃশংস সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিও রাষ্ট্রের ব্যর্থতাই তুলে ধরে।

খাসি নারী প্রতিনিধি হিল্ডা মুকিম বলেন, এখনো তাঁদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বলা হয়, যার কারণে অনেক সুযোগ থেকে তাঁরা বঞ্চিত হন। ভূমি দখল, প্রশাসনিক হয়রানি ও ভোট দিতে গেলে ভয় সব মিলিয়ে তাঁরা আরও পিছিয়ে পড়ছেন। চা–শ্রমিক নেতা হরি সাবর বলেন, কোনো সরকারই আসুক না কেন, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন থেমে থাকে না। ন্যায্য মজুরি, ভূমি অধিকার ও শিক্ষার সুযোগ তাঁদের মৌলিক দাবি।

এছাড়া আলোচকেরা বলেন, দেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতীকী বক্তব্যের বাইরে এসে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য অঙ্গীকার করতে হবে। নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং বৈষম্য কমাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার জরুরি।


শেয়ার করুনঃ

নির্বাচন থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, সিজিএস, গোলটেবিল বৈঠক, সাংবাদিক জিল্লুর রহমান

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ