ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবিগঞ্জে মির্জা ফখরুল
ইতিহাস-ঐতিহ্য
প্রকাশঃ ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৪:৩৭ অপরাহ্ন
‘যার জঙ্গল, তার বেত’-গ্রামবাংলার জনপ্রিয় এই প্রবাদটি একসময় ছিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। দেশের খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পাহাড়ি ঝোঁপঝাড়, এমনকি বাড়ির আঙিনাতেও অবাধে বেড়ে উঠত বেতগাছের সবুজ লতা। সেই বেতকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল গ্রামীণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরির প্রাচীন ঐতিহ্য, লোকজ শিল্পের অনন্য রূপ, আর হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই অতীত আজ দ্রুত মুছে যাচ্ছে। বিলীন হচ্ছে বেতের প্রাকৃতিক ঝাড়, আর তার সঙ্গে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে শতবর্ষী বেতশিল্প।
পৃথিবীর বৃহত্তম গ্রাম হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংসহ সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে একসময় প্রাকৃতিকভাবে জন্মাত বিভিন্ন প্রজাতির বেত। গ্রামীণ ঘরে মোড়া, দোলনা, চালুনি, ডালি, ঝুড়ি, টঙক, মাছ ধরার ফাঁদ, পাখির খাঁচা থেকে শুরু করে নানা আসবাবপত্র পর্যন্ত বেতই ছিল প্রধান কাঁচামাল। পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও সহজলভ্য হওয়ায় বেতগ্রাম ছিল অনেক পরিবারের মুখে হাসির কারণ। বিশেষ করে নারীরা ঘরে বসে বেত বুনে বাড়তি আয় করতেন, যা পরিবারকে করত স্বাবলম্বী। কিন্তু আজ সেই দৃশ্য আর নেই। বনভূমি উজাড়, জলাভূমি ভরাট, কৃষিজমি সম্প্রসারণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যহানির কারণে বেতগাছের স্বাভাবিক প্রজননব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রাকৃতিক বেতঝাড়গুলো দ্রুত কমে যাচ্ছে।
জেলা বন কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, ছোটবেলায় দেখতে পেতাম গ্রামে গঞ্জে বেতের তৈরি মোড়া, টুকরি, মাছ ধরার ফাঁদসহ বিভিন্ন ধরণের কারুকার্যের জিনিসপত্র তৈরি হতো। এখন আর এসব তেমন বেশি চোখে পড়েনা। ধীরে ধীরে যেন সংস্কৃতি থেকে মানুষ দূরে চলে যাচ্ছে। দেশে যে কয়টি প্রজাতির বেত আছে সেগুলোকে সরকারি বেসরকারি জমিতে চাষের উদ্যোগ নিলে হয়তো এ প্রজন্ম বেতশিল্পের সাথে ও বেতের তৈরি আসবাবপত্র ব্যবহারের প্রচলন বাড়তে পারে। পরিকল্পিত চাষ বা বাণিজ্যিক রোপণ না থাকায় কাঁচামালের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে গ্রামীণ কারিগরদের ওপর।
রমিজ আলী নামের কারিগর আক্ষেপ করে বলেন, এলাকায় বেশি বেতের ঝোপজঙ্গল থাকত। এখন আর বেতের ঝোপঝাড় চোখে পড়ে না। আগে বেতই ছিল জীবিকা। এখন বেত পাওয়া দায় বাধ্য হয়ে অন্য কাজে যেতে হচ্ছে।
প্রবীণ কারিগর কলিম উল্লা বলেন, একসময় বাড়ির পেছনে সারি সারি বেতগাছ ছিল। এখনকার শিশুরা বইয়ের ছবিতে দেখে-বাস্তবে বেত কেমন, তা জানেই না।
অন্যদিকে, প্রাকৃতিক সংকটের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আরও বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হয়েছে প্লাস্টিক। কম দাম, রঙিন নকশা আর সহজলভ্যতার কারণে প্লাস্টিকের মোড়া, ঝুড়ি, টোকরি, ডালি, এমনকি শোপিস পর্যন্ত বাজার দখল করে ফেলেছে। বেতপণ্য রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলা, নকশায় বৈচিত্র্যের অভাব এবং বাজারসুবিধা না থাকায় কারিগররা পিছিয়ে পড়ছেন। সস্তা প্লাস্টিকের আগ্রাসনে সংকুচিত হচ্ছে বেতশিল্পের বাজার-একই সঙ্গে পরিবেশও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সবকিছুর মাঝেও কিছু আলো দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন কারুপল্লী, হস্তশিল্পকেন্দ্র ও বিসিক কারিগরদের প্রশিক্ষণ, ডিজাইন উন্নয়ন এবং বাজারসংযোগে কাজ করছে। উদ্যোক্তারাও বেতপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির নতুন পথ খুঁজছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রাকৃতিক বেত পুনঃরোপণ ছাড়া এই শিল্পকে বাঁচানো কঠিন।
বানিয়াচংয়ের বেতশিল্পের ইতিহাস এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একসময় এ অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি গ্রামে ২০–৩০ জন করে বেতশিল্পী পাওয়া যেত। কুশিয়ারা চর, ইসলামীকান্দি, শিবপুর, দৌলতপুর, লম্বাহাতা, রঘুরামপুরসহ বহু এলাকায় ঘরে ঘরে বেত বুনে জীবিকা চলত। সূক্ষ্ম নকশা আর নিপুণ বুননে তৈরি মোড়া, টোকরি, চালুনি, টঙক, ডালি ও মাছ ধরার ফাঁদের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায়। হাট-বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা ছিল ব্যাপক; যা দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ অর্থনীতিকে করেছে শক্তিশালী।
সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও বেতের গ্রহণযোগ্যতা ছিল গভীর। বিয়ের উপহারসামগ্রী, নতুন সন্তানের দোলনা, ঘরোয়া রান্নার চালুনি কিংবা গৃহপ্রবেশে ব্যবহৃত ডালি-সবেতেই জড়িয়ে ছিল মানুষের সংস্কৃতি ও আবেগ। বেত তাই শুধু একটি উপকরণ নয়; ছিল সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও মর্যাদার প্রতীক।
গত দুই-তিন দশকে প্রাকৃতিক বেত কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কারিগরদের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে নাটকীয়ভাবে। বেতের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
অপরদিকে, প্লাস্টিকপণ্যের সস্তা বাজারে তারা ন্যায্য দামও পাচ্ছেন না। যে ঘরগুলোতে দিনের পর দিন বেত বুননের শব্দ শোনা যেত-সেগুলো এখন নীরব।
স্থানীয় কারিগররা মনে করেন, সরকারিভাবে সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ এবং প্রাকৃতিক বেত পুনঃরোপণ প্রকল্প গ্রহণ করা হলে বানিয়াচং আবারও দেশের শীর্ষ বেতশিল্পকেন্দ্র হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদেরও ধারণা-হাওরাঞ্চলের পরিবেশ এখনো বেতচাষের জন্য উপযোগী; প্রয়োজন শুধু সুসংগঠিত উদ্যোগ ও টেকসই পরিকল্পনা।
একসময় হাজারো পরিবারের হাসির কারণ ছিল বেতশিল্প। সেই গৌরবময় দিনগুলো ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই আজও অপেক্ষায় বানিয়াচংয়ের মানুষ। কারণ, একবার ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে তা আর ফিরে আসে না। তাই এখনই সময় উচ্চারণ করার-‘বেত বাঁচাও, গ্রাম বাঁচাও, ঐতিহ্য রক্ষা করো।’
হারিয়ে, যাচ্ছে, বেত, অস্তিত্ব, সংকটে, গ্রামবাংলার, বেতশিল্প