২৫ মে ২০২৬

অপরাধ-বিচার / অপরাধ

‘কিশোর গ্যাং থেকে মাদক কারবার’, র‍্যাব সদস্য হত্যাকারী বাপ্পির উত্থান যেভাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ২৪ মে, ২০২৬ ১১:৩১ অপরাহ্ন


সিলেট নগরীর কিন ব্রিজ এলাকায় র‌্যাব সদস্য ইমন আচার্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার আসাদুল আলম বাপ্পিকে ঘিরে বেরিয়ে আসছে একের পর এক নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য। 

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র বলছে, কিশোর বয়স থেকেই অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বাপ্পি। সময়ের সঙ্গে—সঙ্গে গড়ে তোলেন একটি কিশোর গ্যাং। পরে জড়িয়ে পড়েন ছিনতাই ও মাদক কারবারের সঙ্গেও।

সর্বশেষ গত শুক্রবার (২২ মে) নগরীর কিন ব্রিজ এলাকায় পুলিমের অভিযান চলাকালে পালানোর সময় ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন ইমন আচার্য নামে এক র‌্যাব সদস্যকে। এ ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচিত হয়। 

হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরপরই পুলিশ আটক করেছে বাপ্পিকে। গতকাল শনিবার সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বাপ্পি। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার নিহত র‌্যাব সদস্য ইমন আচার্যের ভাই সুজিত আচার্য কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে বাপ্পিকে।

পুলিশ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর কাজিরবাজার মোগলটুলা এলাকার বাসিন্দা আসাদুল আলম বাপ্পির বাবা আবুল হোসেন ১৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। তবে দীর্ঘদিন ধরেই ছেলের এমন কর্মকাণ্ডের জন্য পরিবারের সঙ্গে বাবা আবুল হোসেনের দূরত্ব ছিল বলে দাবি করেছেন মহানগর বিএনপির নেতারা। 

তারা জানান, ছেলের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে একাধিকবার তাকে পুলিশের হাতেও তুলে দিয়েছিলেন তার বাবা। পরে অপকর্মের কারণে মৌখিকভাবে ত্যাজ্যও ঘোষণা করেন তিনি।

তবে এ ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে না আনার আহ্বান জানিয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক না কেন, তার বিচার হওয়া উচিত। বিএনপি ছিনতাই ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তাই এমন ঘটনায় জড়িত যে কেউ আইনের আওতায় আসবে এবং শাস্তির মুখোমুখি হবে এটাই সত্য।’

এ ঘটনায় রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় টেনে না এনে অপরাধীকে তার ব্যক্তিগত অপরাধের জন্যই দায়ী করা উচিত বলে মন্তব্য করেন ওই বিএনপি নেতা। 

সরেজমিনে বাপ্পির এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। স্কুলজীবনেই তার বিরুদ্ধে মারামারি, দলবল নিয়ে চলাফেরা এবং এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। কয়েক বছর আগে নিজের অনুসারী হিসেবে কয়েকজন কিশোর ও তরুণকে নিয়ে একটি গ্রুপ গড়ে তোলেন তিনি। 

স্থানীয়দের দাবি, ওই গ্রুপটি পরে কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিতি পায়। তারা কিন ব্রিজ, কাজিরবাজার, জিন্দাবাজার ও আশপাশের এলাকায় রাতের বেলায় পথচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতো। অনেকে ভয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেন না বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। 

স্থানীয় ব্যবসায়ীমহলের কয়েকজনের দাবি, বাপ্পি ও তার সহযোগীরা বিভিন্ন সময় দোকানপাট ও আড্ডাস্থলে প্রভাব বিস্তার করতেন।

এদিকে পুলিশ জানায়, গত এক বছরে তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, ছিনতাই ও দ্রুত বিচার আইনে একাধিক মামলা হয়েছে। যদিও মাদকের মামলার বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে, স্থানীয়দের অনেকের দাবি, সম্প্রতি তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে কিন ব্রিজ ও নদীর পাড়ঘেঁষা এলাকাকে কেন্দ্র করে তার একটি সক্রিয় নেটওয়ার্ক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কয়েকজন জানান, রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে বাপ্পি এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ তাদের। তবে এসব বিষয়ে এলাকার কেউই প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হয়নি।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির বলেন, ‘পুলিশ জানায়, শুক্রবার দুপুরে কিন ব্রিজ এলাকায় মাদকসেবী ও কারবারিদের ধরতে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় কয়েকজন পালানোর চেষ্টা করলে র‌্যাব-৯–এর সদস্য ইমন আচার্য বাপ্পিকে আটকাতে যান। তখন ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার বুকে আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।

মাইনুল জাকির বলেন, বাপ্পি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে। হত্যা মামলায় তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’

এদিকে রোববার কাজিরবাজার পশুর হাট পরিদর্শনে গিয়ে র‌্যাব-৯–এর অধিনায়ক তাজমিনুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।’

নিহত ইমন আচার্য চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার পশ্চিম দলই গ্রামের বাসিন্দা। ২০২৪ সালে তিনি র‌্যাবে যোগ দেন এবং গত বছর থেকে র‌্যাব-৯–এ কর্মরত ছিলেন।


শেয়ার করুনঃ

অপরাধ-বিচার থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, র‌্যাব, কিশোর, অপরাধ, পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ