আল হারামাইন হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু: ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি
অনুসন্ধান
প্রকাশঃ ১৬ আগস্ট ২০২৫
দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর ও পার্শ্ববর্তী রেলওয়ে বাঙ্কার এলাকা থেকে গত এক বছর ধরেই চলছিল পাথর লুটপাট। প্রশাসনের চোখের সামনে দিয়ে পাথর লুট করে নিয়ে গেলেও বাঁধা দেওয়া হয়নি। খোঁদ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সামনেও যখন লুটপাট হচ্ছিল, তখনও টনক নড়েনি।
এমনকি রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে শ্রমিক পর্যন্ত মিলেমিশে লুটপাটের সময়ও অন্ধ ছিল প্রশাসন। টনক নড়েছে তখন, যখন বাঙ্কারের পর লন্ডভন্ড করে দেওয়া হয়েছিল সাদা পাথর। ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে এই পুরো পরিবেশকে।
এ অবস্থায় বিধ্বস্ত সাদা পাথর রক্ষায় মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন। সিলেটের বিভিন্ন স্থান থেকে লুট হওয়া সাদা পাথর উদ্ধার করে পুনরায় ফেলা হচ্ছে সাদা পাথরে। কিন্তু প্রকৃতির আপন হাতে সাজানো সেই পাথরের বিছানা কী ফিরে পাওয়া যাবে? সেই প্রশ্ন এখন জনমনে।
যদিও প্রশাসন সাদা পাথরকে তার নিজের জায়গায় ফেরানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আগের রূপে ফেরা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
শনিবার (১৬ আগস্ট) সাদা পাথরে লুটপাটের সময় তৈরি হওয়া গর্তগুলো ঢাকা হয় মাটি ও বালু দিয়ে। পরে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা পানি দিয়ে সমান করা চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, লুট হওয়া পাথরগুলো আগের জায়গায় না ফেলে পানিতে ফেলা হচ্ছে। এ অবস্থাকে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো পরিস্থিতি বলছেন পরিবেশবিদরা।
কারণ গত এক বছরে কী পরিমাণ লুটপাট হয়েছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই প্রশাসনের কাছে। আবার যে পাথরগুলো নিয়ে পুনরায় ফেলা হচ্ছে সেগুলোও আবার লুট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট থেকেই শুরু হয়েছিল সিলেটের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র সাদা পাথরের পাথর লুট। কিন্তু গেল দুই সপ্তাহে লুটেরাদের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের পর্যটনকেন্দ্র সাদা পাথর। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর চোখ খুলে প্রশাসনের, তড়িঘড়ি করে সভা ডেকে লুট করা পাথর ফিরাতে ৫ দফা সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয় অভিযান। লুট করা পাথর উদ্ধার করে ফেলা হচ্ছে সাদা পাথর এলাকায়। এগুলো প্রতিস্থাপনে ক্ষেত্রে রয়েছে নানা অনিয়ম।
কারণ যেসব জায়গা তেকে পাথর লুট হয়েছে, সেখানকার গর্ত ঢাকা হচ্ছে বালু-মাটি দিয়ে। আর পানি প্রবাহের পথে ফেলা হচ্ছে লুটের পাথর। এতে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার এসব পাথর পুনরায় লুটও হতে পারে।
সিলেট জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গেল তিনদিনে সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর এলাকা থেকে লুট হওয়া পাথরে মধ্যে মাত্র ৩ লাখ ৬০ হাজার ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা হয়েছে। যার মধ্যে শনিবারই উদ্ধার হয়েছে আড়াই লাখেরও অধিক ঘনফুট পাথর। তবে এখন পর্যন্ত পাথর প্রতিস্থাপন করা হয়েছে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার ঘনফুট পাথর।
সরজমিনে, শনিবার দিনভর সিলেটের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র সাদা পাথরে গেলে দেখা যায় দুই সপ্তাহে লুট করে পাথর নিয়ে যাওয়ায় সেই স্থানগুলোতে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। নৌকা করে পাথর যেভাবে পানিতে ফেলা হচ্ছে সেগুলো ভোলাগঞ্জের হারিয়ে ফেলা সৌন্দর্য কতটুকু ফিরে আসবে সে নিয়ে আছে সংশয়। কারণ পাথরগুলো যে জায়গায় ফেলা হচ্ছে সেখানে নৌকাগুলো চলাচল করে সেক্ষেত্রে পুনরায় পাথরগুলো লুট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বেশি।
এছাড়া জেলা প্রশাসনের লুট করা পাথর ফেরাতে ৫ দফা সিদ্ধান্তের মধ্যে অন্যতম ছিল সার্বক্ষণিক সাদা পাথর এলাকায় যৌথবাহিনীর অবস্থান করবে। বাস্তবে অভিযানের প্রথম দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দৃশ্যমান থাকলেও গেল দুইদিন তা চোখে পড়েনি।
ভোলাগঞ্জ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আক্তার হুসেন বলেন, ভোলাগঞ্জের মতো অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রকে নিরাপত্তা দেয়ার কথা ছিল প্রশাসনের। কিন্তু আমরা দেখলাম প্রশাসনের চোখের সামনে থেকেই পাথর চুরি করে নিয়ে যায়, দুই সপ্তাহে যে পরিমান পাথর লুট হয়েছে সেটি যদি প্রশাসন বলে তারা জানে না তাহলে এটা তাদের ব্যর্থতা।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)'র সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম সিলেট ভয়েসকে বলেন, প্রশাসন ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের লুট করা পাথর ফেরাতে যা করছে তা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো অবস্থা। তারা লুটপাটের পর যে জনক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল সেটাকে শান্ত করতে এর থেকে ভালো পন্থা তাদের কাছে ছিল না।
তিনি বলেন, আমি মনে করি লুটপাটের পাথর ফেরানো কার্যক্রম চলমান থাকলেও বাস্তবে যারা পাথরগুলো লুট করেছে তাদের প্রশাসন ধরতে পারবে না। কারণ পাথরগুলো যখন লুট করা হচ্ছিলো প্রশাসন তখন চোখ বন্ধ রেখে বসে ছিল, চোখ বন্ধ করার কারণ হয়তো তারা এই লুটের পাথর থেকে শত কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন সেখানে তাদের অংশীদারিত্ব ছিল। এখন যদি আসল আসামিদের প্রশাসন আটক করে তাহলে তলের বেড়াল বেরিয়ে যে আসবে।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন চাইলেই লুট হওয়া পাথরগুলো ট্রাকে উঠার আগেই জব্দ করে ফেলতে পারত। তাহলে এখন অভিযান করে পাথর আটক করা লাগতো না। তবে এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে তারা যে বলছে লুট হওয়া পাথর প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে বাস্তবে কতটুকু প্রতিস্থাপন হচ্ছে? কারণ তারা এটা দেখার জন্য কোন সিভিল সোসাইটির কাউকে অথবা গণমাধ্যমের কাউকে রাখেন নাই, তাহলে পানিতে যে পাথর ফেলা হচ্ছে সেটি আসলে কে মাপতেছেন কিভাবে মাপতেছেন এটা আমি বুঝতেছি না আমার কাছে এটাও একটা শুভঙ্করের ফাঁকি। আমার মতে তারা কিভাবে উদ্ধার করেছে কতুটুকু উদ্ধার এবং কতটুকু পানিতে ফেলা হয়েছে কিভাবে ফেলা হয়েছে কে মেপে দেখেছেন সেগুলো তথ্য জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে তুলে দেয়া হোক।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আজিজুন্নাহার বলেন, আমরা সাদা পাথরের লুট হওয়া পাথরগুলো ফেরাতে কাজ করে যাচ্ছি এবং পাথরগুলো ফিরিয়ে এনে তা আবার প্রতিস্থাপনও করা হচ্ছে। সাদা পাথর এলাকা থেকে যেনো আর পাথর না লুট হয় সেজন্য যৌথবাহিনী কাজ করবে। তবে যৌথাবহিনীর অবস্থান কম নয় পুলিশ সেখানে সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালন করছে।
তিনি আরও বলেন, সাদা পাথরের লুটপাটে জড়িতদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করছে, দ্রুতই সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ সিলেট ভয়েসকে বলেন, সাদা পাথরের লুটপাটে পাথরগুলো ফিরিয়ে আনতে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। এছাড়াও নিয়মিত সাদা পাথর এলাকায় অভিযান পরিচালনা হয়েছে এবং মামলা হয়েছে।
পাথর লুটপাটের মূল আসামিদের ধরতে পারবে না প্রশাসন এমন বক্তব্যকে তিনি অবান্তর বলে মন্তব্য করেন।
সাদা পাথর, লুটপাট, পাথর জব্দ