১৩ মার্চ ২০২৬

যাপিতজীবন / স্বাস্থ্য

ল্যাট্রিনে দরজা নেই, ধুঁকছে দেশের সবচেয়ে বড় কুষ্ঠ হাসপাতাল

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬ ১১:০৮ পূর্বাহ্ন

ছবিঃ সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতাল

ভবনের যত্রতত্র ফাটল, ছাদ চুইয়ে পড়ছে বৃষ্টির পানি আর খসে পড়ছে পলেস্তারা। শৌচাগারে নেই কোনো দরজা, নষ্ট হয়ে পড়ে আছে চিকিৎসায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম।

সিলেটে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও সবচেয়ে বড় কুষ্ঠ হাসপাতালটির এখন এমনই জরাজীর্ণ দশা যে, সেটি নিজেই যেন এক ‘রোগী’তে পরিণত হয়েছে।

১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেটের এই হাসপাতালটি দেশের তিনটি বিশেষায়িত সরকারি কুষ্ঠ হাসপাতালের মধ্যে বৃহত্তম। এখানে শয্যা সংখ্যা ৮০টি থাকলেও বর্তমানে কার্যকর রয়েছে মাত্র ৪৮টি। 

সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালের তথ্যমতে, গত শনিবার হাসপাতালের তিনটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন ১৯ জন। এ ছাড়া প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের তিনটি টয়লেটে নেই কোন দরজা, রোগী দেখার জন্য টিভিগুলো নষ্ট। বাথরুমগুলো ময়লা হয়ে আছে।মূল ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় সেখানে ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা চলছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে।


হাসপাতালের স্টাফরা জানান, বৃষ্টি এলে এর ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এ কারণে সবাই আতঙ্কে থাকেন।

কুষ্ঠ হাসপাতাল হাসপাতালের স্টেটিসটিক্যাল অফিসার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০২০ সালে জেলায় কুষ্ঠরোগী ছিল ২০ জন। ২০২১ সালে ৩৭ জন, ২০২২ সালে ৩৫, ২০২৩ সালে ৭৯ জন, ২০২৪ সালে ৫৯ জন ও ২০২৫ সালে ৫৮ জন ভতি হয়।

কুষ্ঠ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, কুষ্ঠরোগ ছোঁয়াচে নয়, মৃদু সংক্রামক। জীবাণুর মাধ্যমে এর সংক্রমণ হয়। এ জীবাণু হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। প্রথমে চামড়ায় হালকা ফ্যাকাশে বাদামি বা লালচে অনুভূতিহীন দাগ, যেখানে চুলকায় না, ঘামে না এবং ওই স্থানে লোম থাকে না। 

মুখে, ঘাড়ে বা বুকে-পিঠে ব্যথাহীন দানা বা গুটি, কানের লতি ফুলে যাওয়া, হাত-পা চোখে অনুভূতি না পেলে দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানান চিকিৎসকেরা।

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন জন্মেজয় দত্ত বলেন, কুষ্ঠরোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছেন, এর মানে এই নয় যে রোগের সংক্রমণ বাড়ছে। আগেও অনেকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হতেন, তবে তাঁরা শনাক্ত হতেন না। এখন মানুষের সচেতনতা বাড়ছে, তাঁরা চিকিৎসা নিতে আসছেন।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠরোগ নির্মূল করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য বিভাগ এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম বাড়ানোয় সুফল এসেছে।

হাসপাতালের স্ট্যাটিসটিক্যাল অফিসার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ৪.৭২ একর জমিতে ১৮৯০ সালে হাসপাতালটি শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে তিনতলা ফাউন্ডেশনের বিল্ডিংটির একতলা বানানো হয়। পরে আস্তে আস্তে তিনতলা বিলিডং বানানো হয়। বিল্ডিংটি অনেক পুরাতন। তার অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা বারবার উধ্ধতন কমকতাকে জানিয়েছি কিন্তু কোন উদ্দোগ নেওয়া হচ্ছে না।

হাসপাতালের হেড এসিসট্যান্ট সাব্বির আহমেদ বলেন, বৃস্টির দিনে ওয়াল থেকে পলেস্তরা পড়তে শুরু করে। খুবই বিপদজনক বিল্ডিংয়ে পরিনত হয়েছে। যে কোন সময বড় ধরনের দুঘটনা ঘটতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৭০ বছর বয়সী এক রোগী বলেন, আমার হাত পচে গেছিলো। আমার সব পরিক্ষানিরিক্ষা বাইরে করেছি। এখানে কোন ব্যবস্থা নেই।

৬৫ বছর বয়সী আরেক রোগী বলেন, শরীরে চামড়ায় প্রথমে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া দাগ দেখা যায়। পরে সেটি কুষ্ঠরোগ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এখানে ১৪দিন আগে ভতি হয়েছি। সারাদিনে চিকিৎসক মাত্র একবার আসে। অন্যদিকে বিল্ডিংয়ে থাকতে ভয় লাগে। যে কোন সময় পড়ে যেতে পারে।

তাঁদের বহির্বিভাগের রোগী আক্তার হোসেন জানান, তারা যখন হাসপাতালে থাকেন, তখন চোখ থাকে মাথার ওপর; কখন ছাদ থেকে কিছু খুলে পড়ে। 

হাসপাতালের ৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারী বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৯ জন। কুষ্ঠরোগীদের জন্য বিশেষ জুতা তৈরির জন্য একজন কর্মী থাকার কথা হাসপাতালে, এই পদটি ২০২১ সাল থেকে শূন্য।

হাসপাতালের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, আগে আমরা ছয়জন কাজ করেও সামাল দেওয়া যেত না। আর এখন চারজন আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মচারী বলেন, হাসপতালের রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা একেবারেই বন্ধ। জনবল না থাকায় ইনডোরের রোগীরা সেবা বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. নাহিদ রহমান বলেন, বাংলাদেশে তিনটি কুষ্ট রোগের হাসপাতালের মধ্যে সিলেটের হাসপাতালটি সবচেয়ে বড়। অথচ এই হাসপাতালের অবস্থা খুবই করুন। আমরা আমাদের হাইয়ার অথরিটিকে বারবার জানিয়েছি কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না।


শেয়ার করুনঃ

যাপিতজীবন থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, কুষ্ঠ হাসপাতাল, ধুঁকছে, সবচেয়ে বড় কুষ্ঠ হাসপাতাল

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ