সিলেটবাসীর দীর্ঘ আন্দোলন ও ত্যাগের ফসল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি)। প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনায় বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। 


কিন্তু প্রতিষ্ঠার তিন দশক পর এসে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি নানা অভিযোগে জর্জরিত। অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ বাড়ছে দিন দিন। আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলামে পাঠদান চললেও গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। 


বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে সিলেট ভয়েসের সঙ্গে কথা বলেছেন গণিত বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক প্রক্টর ড. মোঃ গোলাম আলী হায়দার চৌধুরী। সিলেট ভয়েস কার্যালয়ে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিলেট ভয়েস সম্পাদক দ্বোহা চৌধুরী


সিলেট ভয়েস : ৭ নভেম্বর শাবিপ্রবিতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনা সভায় আপনার একটি সাহসী বক্তব্য বেশ আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন পর এরকম বক্তব্য রাখার কারণ কী।


ড. হায়দার চৌধুরী : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩ বছর পর এই প্রথম একসাথে ১৭ টা প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব জায়গায় রাতে দিনে কাজ চলছে। কিন্তু এগুলো দেখাশুনা করার যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্বহীনতা দেখে আমি চরমভাবে হতাশ। এ হতাশা থেকেই ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বক্তব্য রেখেছি। 


৭ নভেম্বরের যে মূল তাৎপর্য ছিল জুলুম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা। সেই দুর্নীতি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমাদের শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। ইতিহাসের এই মহানায়কের স্বপ্নকে ছোট ছোট জায়গা থেকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে বিপ্লব দিবসে বলেছি- এতো সুন্দর একটি আলোকিত প্রতিষ্ঠানে সিভিল ও মেকানিক্যাল প্রকৌশল বিভাগ রয়েছে। আপনারা ১৭টা প্রকল্পের জন্য ১৭টি টিম গঠন করুন। প্রত্যেকটি টিমে থাকবে ১০ জন করে ছাত্র ও ৩-৪ জন শিক্ষক থাকবে। তাদের সঙ্গে থাকবে সেনাবাহিনী। তাহলে আর কোনো দুর্নীতি হবে না। 


সিলেট ভয়েস : বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কারা অনিয়ম-দুর্নীতি করছে? 


ড. হায়দার চৌধুরী : বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে যত দুর্নীতি হয়, তার মূলে থাকে প্রকৌশল বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ারের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের অনেক অভিযোগ রয়েছে, তাকে শাস্তিও দেয়া হয়েছে। একাধিকবার সর্তকও করা হয়েছে। কিন্তু অবাক হওয়ার মতো তথ্য-তার চাকরির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু তড়িঘড়ি করে সিন্ডিকেটে তার মেয়াদ আরও ২ বছর বাড়ানো হল। এটা কিসের জন্য করা হলো? 


এটার জন্য আমি বলেছি বিশ্ববিদ্যালয়টি জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়। সুতরাং সকলের নজর দেয়া দরকার। শাবিপ্রবির পর্দায় পর্দায় দুর্নীতি হচ্ছে। এই দুর্নীতি মুক্ত করার জন্য চিৎকার করে মুখের লালা ফেলতেছি কিন্তু কার্যক্রমে কোনোকিছু দেখতে পাচ্ছি না। আমি ভিসি মহোদয়ের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি তিনি যেনো সেগুলো নিয়ে জোর পদক্ষেপ নেন।


সিলেট ভয়েস : বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও দুর্নীতি নিয়ে বেশ আলোচনা উঠেছিল। এখন পরিবর্তিত সময়ে নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব নেয়ার পর আপনি কি মনে করছেন এখনো সাবেক সিন্ডিকেট বা সাবেক চর্চা কাজ করছে?


ড. হায়দার চৌধুরী : হ্যাঁ, এটার পিছনে ১০০ শতাংশ এই সিন্ডিকেট কাজ করছে।


সিলেট ভয়েস: ক্যাম্পাসে এই মুহুর্তে ২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলছে। সেখানে দায়িত্বশীলতার জায়গাটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন? 


ড. হায়দার চৌধুরী : দায়িত্বশীল জায়গায় যাদের দায়িত্বে থাকার কথা ছিল আমি একজনকেও সেই জায়গায় দেখতে পাচ্ছি না। কারণ সব সময় আমাদের চোখের সামনেই কাজগুলো চলছে। প্রথমে সেনাবাহিনীকে এসব প্রকল্পের দায়িত্ব দেয়ার জন্য সাধারণ শিক্ষকরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। শিক্ষকরা বলছিলেন-সেনাবহিনীর টিম থাকলে ভালো হতো। কিন্তু দেওয়া হয়নি। 


সাবেক ভিসি প্রথমে যখনও দুই হাজার কোটি টাকার কাজ নিয়ে আসেন, তখন তিনি  বলেছিলেন কিছু টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য আসছে আপনাদের সকলের দায়িত্ব এটি দেখাশুনা করা। সুতরাং যখন কাজ শুরু হবে তখন আপনারা প্রত্যেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেখাশুনার করার দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে-এ ধরনের কোনো দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি। 



সিলেট ভয়েস: প্রতিষ্ঠার পর থেকে শাবিপ্রবির উপাচার্য হিসেবে সিলেট বিভাগের স্থায়ী বাসিন্দা এমন শিক্ষাবিদদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হতো। বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে যে শিক্ষকরা এসেছেন তারাও এই অঞ্চলের ছিলেন। একটা সময় পর যখন দেখা গেল এই দায়িত্বশীল জায়গা থেকে সিলেটের মানুষরা সরে যাচ্ছেন। এখন কী মনে করছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি সিলেটীদের দায়বদ্ধের যে জায়গা, সেটা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যাচ্ছে?


ড. হায়দার চৌধুরী : শিথিল হয়ে যাচ্ছে যে কথাটি আপনি বলেছেন আমি সেটির সাথে একমত। শিথিল হয়ে যাওয়ার মূল কারণটা হল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভিসি স্যার ছিলেন তিনি সিলেটের বাহিরের লোক ছিলেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজে অনেক অবহেলা করেছেন। তার সময়ে অনেকগুলা বিভাগ খোলার কথা ছিল। এই প্রকল্পের টাকাও এসেছে কিন্তু একটা বিভাগও খোলা হয়নি। কারণ ভিসি স্যার ছিলেন বাহিরের লোক, সিলেটের প্রতি তার কোন দরদই ছিল না। আমার মনে হয়, বর্তমানে যারা রয়েছেন, বিশেষ করে উপ-উপাচার্য তার ভূমিকাটাও রহস্যজনক লাগে। 


আপনারা জানেন হয়তো গত ৫ আগষ্টের পরে যিনি ছাত্রদের সামনে শপথ করে বলেন আমি দায়িত্ব নিচ্ছি, এগুলা ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত নিচু মনের পরিচয় দিয়েছে। এটি একটি অবাক করা কাণ্ড। এটি মনে হয় প্রথম এবং আমার মনে হয় এটিই হবে শেষ। এরকম কলঙ্ক যেনো আর বাংলাদেশের কোন প্রতিষ্ঠানে না ঘটে। 


উন্নয়নতো হচ্ছেই না। এজন্য লেখাপড়ার মানটিও এটির সঙ্গে জড়িত বলে আমি মনে করি। বর্তমান ভিসি মহোদয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে আমি মনে করি। তিনি বলেছেন, বিভিন্ন খোলার খোলার জন্য সহযোগিতা চেয়েছেন এবং কর্তৃপক্ষের কাছে আমি চিঠি লিখেছি।


সিলেট ভয়েস : যেহেতু নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা ওঠেছে, সেহেতু অবশ্যই শাবিপ্রবির বর্তমানে শিক্ষা ও গবেষণার সার্বিক মান আলোচনায় আসা উচিত। 


ড. হায়দার চৌধুরী: শাবিপ্রবির শিক্ষার মান অনেক ভালো। সিলেবাস আন্তর্জাতিক মানের, তবে গবেষণা মানসম্পন্ন নয়। তার মূল কারণটা হল প্রকল্পবাজী। 


সিলেট ভয়েস : একসময় আমরা বলতাম গবেষণায় বরাদ্দ নেই কিংবা কম। যখন আবার গবেষণা খাতে বাজেট বাড়লো, তা কী কোন উপকার আসছে না?


ড. হায়দার চৌধুরী: এখানে প্রসঙ্গে আনতে চাই আন্তজার্তিক বিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলামকে। তিনি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান হলেন, তখন অনেক শিক্ষক বিদেশ যাওয়ার জন্য শিক্ষা ছুটি আবেদন করলেন। তখন তিনি বলতেন আপনি কোন ফিল্ডে যাচ্ছেন? যখন দেখতেন তিনি যে বিভাগের শিক্ষক সেই বিভাগ ছেড়ে অন্য বিভাগ থেকে আবেদন করছেন তখনই ছুটি বাতিল করে দিতেন। 


বর্তমানে একজন গণিতের ছাত্র যেকোন ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে বা যেকোন ইঞ্জিনিয়ারের সাথে ডাটা কালেকশনের কাজ করেও ডক্টরেট ডিগ্রি নিচ্ছে। কিন্তু পিএইচডি ডিগ্রির মূল উদ্দেশ্য হল পাঠদানে প্রযোগ করা। কিন্তু এখন এটি সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। এখন পদন্নোতির জন্য যে যেভাবে পারছে ডিগ্রি একটা নিচ্ছে। ডিগ্রী নিয়েই পদোন্নতি নিচ্ছে। এজন্য গবেষণার মান খুবই খারাপ।


বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সিলেবাসটি যদি দেখেন তাহলে দেখবেন সেটি খুব উন্নত মানের। কিন্তু গবেষণা করা হচ্ছে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক একটি লোভ থেকে। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে এই লোভ ঢুকেছে। এই প্রজেক্ট আনো, ওই প্রজেক্ট আনো, এগুলো সম্পূর্ণরূপে আইনের আওতায় যদি না আনা হয়, তাহলে আমার মনে হয় ধীরে ধীরে দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় যেমন পিছিয়ে যাবে সাথে সাথে ছাত্রদের মন জয় করাটাও কঠিন হয়ে যাবে।

 

সিলেট ভয়েস : এটি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি? নতুনভাবে ঢেলে সাজানো যাবে?


ড. হায়দার চৌধুরী : শতভাগ নতুনভাবে সাজাতে হবে এবং কিছু আইন পাশ করতে হবে। যেমন একজন গণিতের শিক্ষক যদি বিদেশ যেতে হয় তাহলে গণিতের যতগুলো বিষয় আছে, সেগুলোতে উচ্চতর ডিগ্রি নিতেই যেতে হবে। 


[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে প্রদেয় মতামতের দায়ভার বক্তার। এতে প্রকাশিত মন্তব্য বা বক্তব্য সিলেট ভয়েস-এর অবস্থান, নীতিমালা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত নাও করতে পারে। ]

 


শেয়ার করুনঃ

মুক্তমত থেকে আরো পড়ুন

শাবিপ্রবি, সিলেট, উন্নয়ন, প্রকল্প, দুর্নীতি, অনিয়ম, ড. গোলাম আলী হায়দার চৌধুরী, গণিত বিভাগ, সিলেট ভয়েস, সাক্ষাৎকার